নতুন সরকারের জন্য অর্থনীতিতে যেসকল চ্যালেঞ্জ | চ্যানেল আই অনলাইন

নতুন সরকারের জন্য অর্থনীতিতে যেসকল চ্যালেঞ্জ | চ্যানেল আই অনলাইন

নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে এমন এক প্রেক্ষাপটে, যখন দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি একাধিক কাঠামোগত চাপে জর্জরিত। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা, কর্মসংস্থানের সংকট এবং রাজস্ব সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা- সব মিলিয়ে পরিস্থিতি নাজুক। এমন পরিস্থিতি বিবেচনায় অর্থনীতিবীদরা বলছেন, অর্থনীতির ভঙ্গুর স্থিতিশীলতা কাটিয়ে উঠতে হলে দ্রুত, সমন্বিত ও সংস্কারভিত্তিক পদক্ষেপ জরুরি।

মূল্যস্ফীতি: সরকারের সাফল্যের প্রথম মাপকাঠি
বর্তমানে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও নিম্নমুখী হয়নি প্রত্যাশিত মাত্রায়। মজুরি বৃদ্ধির হার কম থাকায় শ্রমজীবী মানুষের প্রকৃত আয় কমছে। রমজানসহ উৎসবকেন্দ্রিক সময়ে নিত্যপণ্যের বাজার অস্থির হয়ে ওঠে- এমন বাস্তবতায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই সরকারের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, শুধু মুদ্রানীতির কড়াকড়ি দিয়ে এই সংকট সামাল দেওয়া যাবে না; সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, বাজার তদারকি এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বাণিজ্য কাঠামো নিশ্চিত করাও জরুরি। সরকারের উচিত দ্রুত একটি সমন্বিত ‘অ্যান্টি-ইনফ্লেশন অ্যাকশন প্ল্যান’ ঘোষণা করা, যাতে স্বল্পমেয়াদি বাজার ব্যবস্থাপনা ও মধ্যমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার- দুই দিকই থাকে।

বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান: প্রবৃদ্ধির ভিত্তি দুর্বল
বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির তুলনায় কমে এসেছে। শিল্প ও সেবা খাতে প্রবৃদ্ধি মন্থর হওয়ায় কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ কাজ হারিয়েছেন বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। ব্যাংকঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া এবং ব্যবসায়ীদের আস্থাহীনতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

এ অবস্থায় সরকারের জন্য বার্তা স্পষ্ট- ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফেরানো ছাড়া বিনিয়োগে গতি আসবে না। খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক পরিচালনায় সুশাসন এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত না হলে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অধরাই থেকে যাবে। প্রবৃদ্ধি বাড়াতে গিয়ে আবার যেন রিজার্ভের ওপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে, সে দিকেও নজর রাখতে হবে।

আইএমএফ কর্মসূচি: শর্ত ও বাস্তবতার সমীকরণ
বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) কর্মসূচিতে যুক্ত হয়েছে। এই কর্মসূচির আওতায় রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, মুদ্রানীতিতে শৃঙ্খলা এবং আর্থিক খাত সংস্কারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। আইএমএফের সমর্থন আন্তর্জাতিক আস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর শর্ত বাস্তবায়ন রাজনৈতিকভাবে কঠিন।

পিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন: সরকারের সামনে এখন প্রশ্ন রয়েছে, সংকোচনমূলক নীতি বজায় রেখে মূল্যস্ফীতি কমাবে, নাকি প্রবৃদ্ধির স্বার্থে কিছুটা শিথিলতার চেষ্টা করবে? বাস্তবতা হলো, এ দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ।

রাজস্ব সংকট ও ঋণের ফাঁদ
কর-জিডিপি অনুপাত এখনো নিম্নমুখী। অভ্যন্তরীণ রাজস্ব দিয়ে পরিচালন ব্যয় মেটানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে ঋণ পরিশোধে নতুন ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকারি ঋণ দ্রুত বেড়েছে, বিশেষ করে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন: এ পরিস্থিতিতে করহার বাড়ানোর আগে কর প্রশাসনের সংস্কার জরুরি। ভ্যাট ও আয়করে ফাঁকি রোধ, ডিজিটালাইজেশন জোরদার এবং কর অব্যাহতির সংস্কৃতি কমানো- এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করলে রাজস্ব আহরণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। অন্যথায় উন্নয়ন ব্যয় সংকুচিত হয়ে পড়বে।

ব্যাংকিং খাত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর একযোগে মুদ্রানীতি প্রণয়ন ও ব্যাংক তদারকির দায়িত্ব থাকায় স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন উঠছে। অর্থনীতিবীদরা মনে করছেন, তদারকি কাঠামো আলাদা করা গেলে স্বচ্ছতা বাড়বে। আর্থিক খাত শক্তিশালী না হলে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির ভিত্তি মজবুত হবে না।

এলডিসি উত্তরণ: সুযোগ না ঝুঁকি?
নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের নির্ধারিত সময় ঘনিয়ে আসছে। এটি উন্নয়নের স্বীকৃতি হলেও রপ্তানি সুবিধা কমার ঝুঁকিও তৈরি করবে। তাই উত্তরণের আগে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরদিনই বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করেছে।

সব মিলিয়ে নতুন সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জের পাহাড়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব ও ব্যাংকিং সংস্কার, ঋণের চাপ সামাল এবং বিনিয়োগ পুনরুদ্ধার-সবকিছুই পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। এখন প্রয়োজন বাস্তবসম্মত অগ্রাধিকার নির্ধারণ, ধাপে ধাপে সংস্কার এবং রাজনৈতিক দৃঢ়তা।

Scroll to Top