
ছবি : সংগৃহীত
নিরাপত্তা জোরদার, সরকারি ছুটি বৃদ্ধি, আর্থিক সহায়তা এবং প্রশাসনের সমন্বিত তৎপরতায় বাংলাদেশে এ বছর শান্তিপূর্ণ পরিবেশে শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই ছিল প্রথম দুর্গাপূজা। উৎসবকে ঘিরে বড় ধরনের সাম্প্রদায়িক সহিংসতা না ঘটায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেক সদস্য ও পূজা উদযাপন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তবে তাদের মতে, এই নিরাপত্তা ও সম্প্রীতি সারা বছর বজায় রাখাই হবে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডের ২৫ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ বছর দুর্গাপূজার নিরাপত্তাকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেয় সরকার। দেশজুড়ে পূজামণ্ডপগুলোতে বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা হয়।
দেশজুড়ে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা
সরকারি ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ বছর দেশের প্রায় ৩৩ হাজার ৮৬১টি পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় প্রায় ছয় হাজার নিরাপত্তাকর্মী, ৫৫০টি পিকআপ ভ্যান এবং ৪৫০টি মোটরসাইকেল মোতায়েন করা হয়। রাজধানী ঢাকার ২৫৭টি পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করেন ঢাকা মহানগর পুলিশের প্রায় ২ হাজার ১০০ সদস্য।
এ ছাড়া বিভিন্ন পর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন এবং পূজা উদ্যাপন কমিটির মধ্যে সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। আগাম প্রস্তুতি ও বাড়তি নজরদারির ফলে উৎসব চলাকালে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা পাওয়া যায়।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ও সরাসরি সম্পৃক্ততা
দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ এলাকায় সতর্ক থাকার এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার নির্দেশ দেন। ১২ অক্টোবর বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠকে তিনি ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং উৎসব বিঘ্নিত করার যেকোনো অপচেষ্টা প্রতিরোধে সতর্ক থাকার ওপর গুরুত্ব দেন বলে বাসসের প্রতিবেদনে জানানো হয়।
১৬ অক্টোবর উৎসবের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী সব ধর্মের মানুষের নিরাপত্তা ও সমান অধিকারের কথা তুলে ধরেন। পরে ২০ অক্টোবর তিনি রংপুর, রাজশাহী ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। এসব কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরা হয়।
ছুটি বৃদ্ধি ও আর্থিক সহায়তা
নিরাপত্তার পাশাপাশি উৎসব উদ্যাপনে ভক্তদের অংশগ্রহণ সহজ করতে সরকারি ছুটি বাড়ানো হয়। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০ থেকে ২২ অক্টোবর দুর্গাপূজা উপলক্ষে সরকারি ছুটি নির্ধারণ করা হয়। এর সঙ্গে সাপ্তাহিক ছুটি যুক্ত হওয়ায় সরকারি কর্মচারীরা ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত টানা পাঁচ দিনের অবকাশ পান।
এ ছাড়া দুর্গাপূজার জন্য সরকারি আর্থিক বরাদ্দ চার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে পাঁচ কোটি টাকা করা হয়। পূজা উদ্যাপন কমিটির প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, বাড়তি সহায়তা উৎসবের আয়োজন ও ব্যবস্থাপনায় কাজে এসেছে। তাঁদের মতে, নিরাপত্তা ও আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি ছুটি বৃদ্ধি ভক্তদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার সুযোগও বাড়িয়েছে।
বিচ্ছিন্ন ঘটনায় দ্রুত ব্যবস্থা
উৎসব চলাকালে গাজীপুরের কোনাবাড়ীতে একটি মন্দিরে পবিত্র কোরআনের একটি কপিতে আগুন দেওয়ার অভিযোগে এক ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মন্দিরের নিরাপত্তাকর্মী ও সেখানে দায়িত্বে থাকা পুলিশ দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ফলে ঘটনাটি বড় ধরনের সাম্প্রদায়িক সংঘাতে রূপ নেওয়া থেকে ঠেকানো সম্ভব হয়।
ধর্মীয়ভাবে সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে দ্রুত পদক্ষেপের গুরুত্ব এই ঘটনা আবারও সামনে এনেছে। একই সঙ্গে এমন ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর নজরদারি, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তাও স্পষ্ট হয়েছে।
স্বস্তির পাশাপাশি রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি প্রত্যাশা
বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের পেছনে অতীতের সহিংসতার স্মৃতি রয়েছে। ২০২১ সালে কুমিল্লার একটি পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন পাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে মন্দির, প্রতিমা, বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা হয়েছিল। এসব ঘটনার বিচার ও জবাবদিহি নিয়ে পরবর্তী সময়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এ বছরের দুর্গাপূজা তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ হওয়ায় অনেকের মধ্যে স্বস্তি তৈরি হয়েছে। তবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের প্রত্যাশা, উৎসবের কয়েক দিনের নিরাপত্তার মধ্যেই সরকারের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ থাকবে না। সারা বছর ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সাম্প্রদায়িক উসকানি প্রতিরোধ এবং হামলার ঘটনায় কার্যকর বিচার নিশ্চিত করার ওপরও তাঁরা গুরুত্ব দিয়েছেন।
সব মিলিয়ে, এ বছরের দুর্গাপূজায় সরকারের আগাম নিরাপত্তাপ্রস্তুতি, প্রশাসনিক সমন্বয়, ছুটি বৃদ্ধি, আর্থিক সহায়তা এবং প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি সম্পৃক্ততা উৎসবের পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রাখতে ভূমিকা রেখেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে এই উদ্যোগের স্থায়ী সাফল্য নির্ভর করবে ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে সব নাগরিকের নিরাপত্তা, সমান অধিকার ও ন্যায়বিচার সারা বছর নিশ্চিত করার ওপর।
আরও পড়ুন
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…

