তারেক রহমানের ভারত সফরে ধোঁয়াশা, শেখ হাসিনাই কী দুই দেশের সম্পর্কে বড় বাধা? | চ্যানেল আই অনলাইন

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফর নিয়ে এখনো কাটেনি ধোঁয়াশা। কয়েক সপ্তাহ ধরে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে সফর নিয়ে আলোচনা চললেও এখনও কোনো তারিখ আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হয়নি। বরং সফরের জন্য একটি ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরি করা প্রয়োজন বলে জানিয়েছে ঢাকা। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যুই দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে বড় জটিলতা তৈরি করেছে।

রোববার (২৩ আগস্ট) প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে আল-জাজিরা জানিয়েছে, দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা চললেও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঘিরে নতুন করে জটিলতা তৈরি হওয়ায় সফরটি থমকে আছে। তথ্য অনুযায়ী, ভারত চলতি আগস্টে তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। ২১ থেকে ২৫ আগস্টের মধ্যে সফর হতে পারে এমন আলোচনা থাকলেও দুই সরকার কোনো তারিখ আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি।

শেখ হাসিনার বক্তব্যে বদলে যায় পরিস্থিতি

আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনার একটি সংবাদ সম্মেলনের পর সফর ঘিরে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ঢাকার অভিযোগ, ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনার প্রকাশ্য বক্তব্য দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তবে ভারত জানিয়েছে, ওই অনুষ্ঠানের সঙ্গে দেশটির সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। এরপরও বাংলাদেশের অবস্থান বদলায়নি। ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারেক রহমানের সফরের জন্য একটি ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরি হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে শেখ হাসিনা ও অন্য পলাতক আসামিদের প্রত্যর্পণের অনুরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ।

সফর নিয়ে ভারতের অবস্থান

তারেক রহমানের সফর নিয়ে নয়াদিল্লি এখনো বিস্তারিত কোনো সিদ্ধান্ত প্রকাশ করেনি। আল জাজিরার প্রতিবেদনে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। সফর নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এই মুহূর্তে বলার মতো কিছু নেই। তবে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে বলেছেন, দুই দেশের সম্পর্ককে ‘পারস্পরিক স্বার্থের পরীক্ষায়’ উত্তীর্ণ হতে হবে। অর্থাৎ সম্পর্কের ক্ষেত্রে উভয় দেশের স্বার্থকে গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরও জানিয়েছেন, তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে ঢাকার কোনো তাড়াহুড়া নেই। নতুন সরকারের সঙ্গে ভারত কী ধরনের সম্পর্ক চায়, বাংলাদেশ সেটি বোঝার চেষ্টা করছে।

শেখ হাসিনাই বড় বিরোধের জায়গা

আল জাজিরার বিশ্লেষণে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সবচেয়ে বড় জটিলতা হিসেবে শেখ হাসিনার বিষয়টি উঠে এসেছে।২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে চলে যান শেখ হাসিনা। এরপর থেকেই তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর দাবি জানিয়ে আসছে ঢাকা। বাংলাদেশে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে এবং ২০২৫ সালের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তার অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেন। তবে শেখ হাসিনা অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শেখ হাসিনা ও অন্য পলাতক আসামিদের দ্রুত প্রত্যর্পণের জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ করা হয়েছে।

দুই দেশের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকলেও রাজনৈতিক অপরাধের ক্ষেত্রে কিছু ব্যতিক্রমের সুযোগ রয়েছে। ফলে বিষয়টি দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ অমীমাংসিত ইস্যু হয়ে আছে।

২৯ জুন, ২০২৬; ঢাকায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ম্যুরালের পাশ দিয়ে যানবাহন চলাচল করছে। ছবি- মোহাম্মদ পনির হোসেন (রয়টার্স)

বদলে গেছে দিল্লি-ঢাকার সমীকরণ

আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সেই সম্পর্কের সমীকরণ বদলে গেছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমতা ও পারস্পরিক স্বার্থের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শাকিল আহমেদের মতে, দুই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এখন পররাষ্ট্রনীতিতেও প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশের মানুষ ভারতের সঙ্গে এমন সম্পর্ক চায়, যেখানে আত্মমর্যাদা ও পারস্পরিক স্বার্থ গুরুত্ব পাবে।

সীমান্ত ও অভিবাসন নিয়েও বিরোধ

শেখ হাসিনাকে ঘিরে বিরোধের বাইরে সীমান্ত ও অভিবাসন নিয়েও বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। প্রায় ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তে ভারতের বেড়া নির্মাণের উদ্যোগ নিয়ে বাংলাদেশের অসন্তোষ রয়েছে। সীমান্তে বিভিন্ন সময়ে উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনাও দুই দেশের সম্পর্কে প্রভাব ফেলেছে। এছাড়া ভারত যাদের অনিবন্ধিত বাংলাদেশি অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করছে, তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো নিয়েও বিরোধ রয়েছে। ঢাকার অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে যথাযথ কূটনৈতিক যাচাই ছাড়াই মানুষকে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। ভারতের ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতার বাংলাদেশবিরোধী বক্তব্যও দুই দেশের সম্পর্কে অস্বস্তি বাড়িয়েছে।

পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাও নজরে দিল্লির

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ বেড়েছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে এটিকেও ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণে স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে বিশেষ ঘনিষ্ঠতা ছিল। তবে বর্তমান সরকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির ভিত্তিতে পররাষ্ট্র সম্পর্ককে নতুনভাবে সাজাতে চাইছে। সার্বভৌম সমতা, জাতীয় মর্যাদা, একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছে ঢাকা।

সামনে কী হতে পারে

বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের ভারত সফর বিলম্বিত বা স্থগিত হওয়া মানেই দুই দেশের সম্পর্ক ভেঙে পড়া নয়। বরং বর্তমান পরিস্থিতিতে নিয়মিত রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ আরও গুরুত্বপূর্ণ।

আল জাজিরার প্রতিবেদনে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশীয় অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক সঞ্জয় ভরদ্বাজের মতামতও তুলে ধরা হয়েছে। তার মতে, ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী। তবে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যু দুই দেশের সম্পর্কের বড় বাধা হয়ে আছে।

অন্যদিকে ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত মনে করেন, দুই দেশের মধ্যে আলোচনার কোনো বিকল্প নেই। প্রতিবেশী দেশ হওয়ায় বাংলাদেশ ও ভারত একে অপরের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে পারে না। সম্পর্কের টানাপোড়েন কাটাতে রাজনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি বাস্তব স্বার্থভিত্তিক সহযোগিতা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফরের তারিখ এখনো অনিশ্চিত। তবে আল জাজিরার প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য ও বিশ্লেষণ বলছে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, সীমান্ত, আঞ্চলিক রাজনীতি ও পারস্পরিক আস্থার প্রশ্নগুলোই এখন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

Scroll to Top