চারশো বছর আগের সুবে বাংলার রাজধানী আর আজকের ব্যস্ত মেগাসিটি। মাঝখানের এই দীর্ঘ সময়রেখায় ঢাকার সবচেয়ে বড় উৎসবটি নিজের খোলস পাল্টেছে বহুবার। খোলা ছাদে দাঁড়িয়ে খালি চোখে শাওয়ালের চাঁদের রূপালি রেখা খোঁজার সেই দিনগুলো এখন বন্দি হয়েছে অন্তর্জালের দ্রুতগতিতে; যেখানে চোখের পলকেই ভেসে আসে উৎসবের প্রথম বার্তা।
মুঘল জমানার রাজকীয় তোপধ্বনি কিংবা বুড়িগঙ্গার তীরের আভিজাত্য থেকে বেরিয়ে এই আয়োজন আজ অনায়াসে মিশে গেছে আধুনিক তারুণ্যের ভার্চুয়াল জগতে। তবে উদ্যাপনের ব্যাকরণ যতটাই বদলাক না কেন, মানুষের সাথে মানুষের আত্মার যে চিরন্তন স্পন্দন, তা আজও অমলিন। ইতিহাস আর আধুনিকতার এই মেলবন্ধনে চলুন ফিরে তাকাই কালচক্রে বদলে যাওয়া ঢাকার ঈদের এক বিস্ময়কর যাত্রায়।
নবাব ও নায়েব-নাজিমদের ঈদ
ইতিহাসের পাতা থেকে ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুনের গবেষণায় দেখা যায়, আজ আমরা যে সর্বজনীন ঈদ উদ্যাপন দেখি, শত বা দেড় শত বছর আগে তা এমন ছিল না। আঠারো শতকে মুঘল আমলে ঢাকায় ঈদ ছিল মূলত নবাব, নায়েব-নাজিম এবং উচ্চবিত্তদের উৎসব। সাধারণ মানুষের জন্য তা ছিল অনেকটা দূর থেকে দেখার বিষয়। সেকালের ঈদের প্রধান আকর্ষণ ছিল ‘ঈদ মিছিল’।
ঈদের সকালে নায়েব-নাজিমদের নিমতলী প্রাসাদ থেকে এই বর্ণাঢ্য মিছিল বের হতো। সুসজ্জিত হাতির পিঠে হাওদায় বসতেন নায়েব-নাজিম। মিছিলে থাকত উট, ঘোড়া, পালকি আর নানা রঙের নিশান। বেজে উঠত কাড়া-নাকাড়া আর শিঙা। সাধারণ মানুষ রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে এই জাঁকজমকপূর্ণ মিছিল দেখত। সেসময় চাঁদ দেখার খবরও সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাত নবাববাড়ি থেকে ছোড়া তোপধ্বনির মাধ্যমে। উনিশ শতকের মাঝামাঝি নায়েব-নাজিম বংশ লুপ্ত হলে ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় এই রাজকীয় ঈদ মিছিল।
সাধারণ মানুষের ঈদ
একটি ঐতিহ্যের উন্মেষ কালের আবর্তনে ঈদ কীভাবে সাধারণ মানুষের উৎসবে পরিণত হলো, তার একটি বড় ইতিহাস রয়েছে। ১৬৪০ সালে বাংলার সুবেদার শাহ সুজার অমাত্য (মন্ত্রী) মীর আবুল কাসিম ধানমন্ডিতে যে শাহী ঈদগাহ নির্মাণ করেছিলেন, তা ছিল ঢাকার প্রথম বড় আকারের ঈদগাহ। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে দেখা যায়, তৎকালীন মূল নগরী অর্থাৎ পুরান ঢাকা থেকে বেশ দূরে হলেও খোলা ও উঁচু জমি এবং সাত মসজিদের কাছাকাছি হওয়ায় ধানমন্ডি এলাকাটিকে বেছে নেওয়া হয়েছিল। এর পাশ দিয়েই তখন বয়ে যেত পাণ্ডু নদীর একটি শাখা, যা বুড়িগঙ্গার সাথে স্থল ও জলপথ, উভয় দিক দিয়েই যোগাযোগ সহজতর করেছিল। স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে এটি একটি উঁচু প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্মিত হয়েছিল, যা বন্যার হাত থেকে রক্ষা করত। এর পশ্চিম দিকে রয়েছে সুদৃশ্য কেন্দ্রীয় মেহরাব, যা খাঁজকাটা ধনুকাকৃতির প্যানেল নকশা দ্বারা অলঙ্কৃত। চারপাশের প্রাচীরের কোণে ছিল অষ্টাভূজাকৃতির বুরুজ। মীর আবুল কাসিম, যিনি একই সাথে বড় কাটরা নির্মাণের নেপথ্যে ছিলেন, তিনি এই ঈদগাহে মুঘল আভিজাত্যের নিখুঁত ছোঁয়া রেখেছিলেন।
প্রথমদিকে এই ঈদগাহ ছিল কেবল রাজকীয় ব্যক্তিবর্গ, মুঘল দেওয়ান ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের একান্ত নামাজ পড়ার স্থান; সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার এখানে ছিল না। তবে ফরায়েজি আন্দোলনের প্রভাব এবং বাংলায় মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থানের সাথে সাথে উনিশ শতকের শেষ ভাগে এসে ঈদ সর্বজনীন রূপ পেতে শুরু করে। ধানমন্ডি ঈদগাহ এবং চকবাজারকে ঘিরে মেলার আয়োজন শুরু হয়। এভাবেই ঈদ হয়ে ওঠে বাংলার আপামর জনতার মিলনমেলা। সেসময়কার ঈদের খাবারেও ছিল আভিজাত্যের ছোঁয়া; সাধারণ মানুষের ঘরেও তৈরি হতো বিশেষ ধরনের বাকরখানি, কোরমা আর সেমাই।
নস্টালজিয়ায় মোড়ানো সেই পুরোনো দিনগুলো যারা গত শতকের সত্তর, আশি বা নব্বইয়ের দশকে শৈশব কাটিয়েছেন, তাদের কাছে ঈদের স্মৃতি বড্ড আবেগের। সেই সময়ে চাঁদরাত মানেই ছিল এক অন্যরকম রোমাঞ্চ। রেডিও বা বিটিভিতে কখন চাঁদ দেখার ঘোষণা আসবে, তার জন্য পাড়াজুড়ে অপেক্ষা চলত। ঘোষণা আসার পর মুহূর্তে চারদিকে বেজে উঠত কাজী নজরুল ইসলামের সেই কালজয়ী গান,”ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে…”।
দর্জির দোকানে নতুন জামার মাপ দেওয়া, আর চাঁদরাতে সেই জামা হাতে পেয়ে বালিশের নিচে রেখে ঘুমানোর যে নির্মল আনন্দ, তা আজকের দিনে হয়তো বিরল। তখন ঈদের বড় একটি অংশ জুড়ে ছিল প্রিয়জনকে ডাকযোগে ‘ঈদ মোবারক’ লেখা রঙিন কার্ড পাঠানো। ঈদের দিন সকালে মুরুব্বিদের পা ছুঁয়ে সালাম করে পাওয়া চকচকে নতুন টাকার নোট বা কয়েন যাকে ‘সালামি’ বলা হতো, তা জমানোর মধ্যে লুকিয়ে ছিল এক পৃথিবীর সুখ। চটপটি, জিলাপি আর চকবাজারের মেলায় ঘুরে বেড়ানোই ছিল সেই প্রজন্মের নির্ভেজাল আনন্দ।
জেন-জি প্রজন্মের ডিজিটাল ঈদ
নতুন সময়ের নতুন আনন্দ। সময় পাল্টেছে, আর তার সাথে তাল মিলিয়ে বদলেছে নতুন প্রজন্মের, বিশেষ করে ‘জেনারেশন জেড’ বা জেন-জি’র ঈদ উদ্যাপন। তাদের কাছে চাঁদ দেখার খবর প্রথম আসে ফেসবুকের নিউজফিড বা কোনো অনলাইন নিউজ পোর্টাল থেকে। ঈদ কার্ডের জায়গা এখন দখল করে নিয়েছে হোয়াটসঅ্যাপের জিআইএফ, মেসেঞ্জারের কাস্টমাইজড স্টিকার আর ইনস্টাগ্রামের রিলস।
দর্জির দোকানের সেই লম্বা লাইনের বদলে এখনকার তরুণ-তরুণীরা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন অনলাইন শপিং বা নামিদামি ব্র্যান্ডের রেডিমেড পোশাকে। ঈদের দিন সকালে পাঞ্জাবি বা শাড়ি পরে স্মার্টফোনে নিখুঁত একটি সেলফি বা টিকটক ভিডিও তৈরি করা তাদের উদ্যাপনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পুরোনো প্রজন্মের মতো পাড়া ঘুরে সালামি সংগ্রহের বদলে, এখন অনেকেই মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপের মাধ্যমে ডিজিটাল সালামি পেয়ে থাকেন। ঈদের দিন বিকালে শুধু আত্মীয়স্বজনের বাসায় বসে না থেকে, বন্ধুদের সাথে কোনো ক্যাফেতে আড্ডা দেওয়া বা ঢাকার আশেপাশের কোনো রিসোর্টে ঘুরতে যাওয়াই এখনকার জেন-জিদের কাছে বেশি আকর্ষণীয়।
পরিশেষে বলতে হয়, প্রাচীন ঢাকার নিমতলী প্রাসাদের সেই হাতির মিছিল আজ আর নেই। নেই রেডিওতে বা বিটিভিতে চাঁদ দেখার খবর শোনার সেই তুমুল উত্তেজনা। কিন্তু যা আছে তা হলো, খুশি। ইতিহাস তার রূপ বদলায়, প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাদের নিজস্ব স্টাইলে আনন্দ উদ্যাপন করে। সেই আদিম জাঁকজমকপূর্ণ ঈদ থেকে শুরু করে আজকের জেন-জি’র ডিজিটাল ঈদ। মাঝখানে বিস্তর ফারাক থাকলেও, উৎসবের মূল সুরটি কিন্তু একই রয়ে গেছে। অতীত আমাদের শেকড় মনে করিয়ে দেয়, আর বর্তমান শেখায় কীভাবে সময়ের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিয়েও ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়। ঈদ সব যুগেই আনন্দের, ঈদ সব যুগেই মহামিলনের।





