জ্বালানি তেল পরিশোধন প্রকল্পে ‘নতুন সংকট’

দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) দ্বিতীয় ইউনিট বাস্তবায়নে আবারও নতুন সংকট তৈরি হয়েছে। প্রকল্পটির বর্তমান প্রকল্প পরিচালক (পিডি) এবং সরকারের যুগ্ম সচিব আসমা আরা বেগম দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চেয়ে সরকারের কাছে আবেদন করেছেন। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কারণ দেখিয়ে তিনি দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ফলে প্রকল্পটির জন্য আবারও নতুন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দিতে হবে। এতে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা প্রকল্পটির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া আরও পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আইএস

প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র দুই মাসের মাথায় তার এই সরে দাঁড়ানোর আবেদন প্রকল্পটির বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। কারণ, প্রায় দেড় যুগ ধরে নানা জটিলতায় আটকে থাকা এই প্রকল্প বাস্তবায়নে বর্তমান সরকার নতুন করে উদ্যোগ নিলেও একের পর এক বাধার মুখে পড়ছে।

প্রকল্প পরিচালক তার অব্যাহতির আবেদনটি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিবের কাছে পাঠিয়েছেন। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যানের মাধ্যমে পাঠানো ওই চিঠিতে তিনি ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেছেন। চিঠিতে তিনি জানান, তার পরিবারের দুই সন্তান বর্তমানে বেড়ে ওঠার গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। তাদের শিক্ষা, মানসিক বিকাশ ও যথাযথ তত্ত্বাবধানের জন্য মায়ের প্রত্যক্ষ সান্নিধ্য প্রয়োজন। এ অবস্থায় এত বৃহৎ ও জটিল প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে প্রয়োজনীয় সময়, মনোযোগ ও শ্রম দেওয়া তাঁর পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ছে।

এদিকে এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক আসমা আরা বেগমের কাছে প্রকল্প থেকে স্বেচ্ছাআমাদের সময়কে বলেন, ইআরএল দ্বিতীয় ইউনিট প্রকল্পটিকে তিনি নিজের সন্তানের মতোই ভালোবাসতেন। দীর্ঘ ১৭ বছরেও যে প্রকল্প বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি, সেই প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বপ্ন নিয়েই তিনি দায়িত্ব নিয়েছিলেন। প্রকল্পের জন্য অনেক কাজ করেছেন এবং এটি বাস্তবায়নে তাঁর ব্যক্তিগত ও পেশাগত আগ্রহ ছিল অত্যন্ত বেশি। কিন্তু সংশ্লিষ্ট অনেকের অসহযোগিতার কারণে প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়া তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে তিনি আর প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বে থাকতে চাইছেন না।

এদিকে প্রকল্প পরিচালকের অব্যাহতির আবেদনপত্রেও প্রকল্পটির সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা ও আন্তরিকতার বিষয়টি উঠে এসেছে। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেছেন, ২০০৯ সালে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) সম্পন্ন হলেও দীর্ঘ ১৭ বছরেও এটি বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতায় ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়। এরপর ২০২৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি প্রশাসনিক আদেশ জারি করা হয়।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তা হিসেবে প্রকল্পটির উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রণয়ন, ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (আইএসডিবি) অর্থায়ন এবং বাস্তবায়ন কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন বর্তমান প্রকল্প পরিচালক। পরে গত ২ সেপ্টেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আদেশে তাঁকে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়। ৭ সেপ্টেম্বর তিনি বিপিসিতে প্রেষণে যোগদান করেন।

কিন্তু প্রকল্পের দায়িত্ব নেওয়ার পরও বাস্তবায়ন কার্যক্রম প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি; বরং প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হয়। এর মধ্যে প্রকল্প পরিচালকের সরে দাঁড়ানোর আবেদন নতুন করে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে। তাঁর আবেদন গৃহীত হলে নতুন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের জন্য আবারও দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।

জ্বালানি খাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের অপরিশোধিত তেল পরিশোধন সক্ষমতা বাড়বে। একই সঙ্গে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারের সুযোগ তৈরি হবে। অথচ দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, অর্থায়ন ও প্রশাসনিক অনুমোদনের পরও প্রকল্পটি এখনো বাস্তবায়নের মূল পর্যায়ে পৌঁছাতে পারছে না।

সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু প্রকল্প অনুমোদন ও অর্থায়নের ব্যবস্থা করলেই এ ধরনের বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন দক্ষ ও স্থিতিশীল প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয় এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ। একের পর এক প্রশাসনিক ও বাস্তবায়নগত জটিলতা দূর করা না গেলে ইআরএল দ্বিতীয় ইউনিট প্রকল্পের দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটানো কঠিন হবে।

প্রায় ১৭ বছর অপেক্ষার পর প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নতুন গতি পাবে—এমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু পরামর্শক নিয়োগে জটিলতা এবং এবার প্রকল্প পরিচালকের সরে দাঁড়ানোর আবেদনে সেই প্রত্যাশা আবারও ধাক্কা খেল। ফলে দেশের বহুল প্রত্যাশিত এই তেল পরিশোধন প্রকল্পের বাস্তবায়ন কবে নাগাদ শুরু হবে, তা নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

এদিকে নাম প্রকাশ না করাআমাদের সময়কে বলেন, ইআরএল দ্বিতীয় ইউনিট বা ‘মডার্নাইজেশন অ্যান্ড এক্সপ্যানশন অব ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)’ একটি উচ্চমাত্রার কারিগরি প্রকল্প। এ প্রকল্পে কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন বা অভিজ্ঞ কোনো কর্মকর্তার প্রকল্প পরিচালক হওয়া জরুরি। তা না হলে বিভিন্ন পর্যায়ে প্রকল্পটি বারবার বাধাগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তারা আরও জানান, শুরুতেই প্রকল্পের আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। চূড়ান্ত মূল্যায়নের পরও সেটা বাতিল করে সরকার। এসব বিষয় নিয়ে মন্ত্রণালয়েও অস্বস্তি রয়েছে।

বিপিসির আমাদের সময়কে জানান, বর্তমান প্রকল্প পরিচালক অব্যাহতি নিলে তারা জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করবেন, যেন পরবর্তীতে কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন কোনো কর্মকর্তাকেই প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

উল্লেখ্য, দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)। প্রতিষ্ঠানটি নিয়ন্ত্রণ করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। ২০০৯ সালে প্রকল্পটির ফিজিবিলিটি স্টাডি হয়। পরে ২০১২ সালে বার্ষিক ৩০ লাখ মেট্রিক টন পরিশোধন সক্ষমতার ‘ইনস্টলেশন অব ইআরএল ইউনিট-২’ প্রকল্প হাতে নেয় বিপিসি। কিন্তু ১৭ বছর পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পটির মূল কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে ইস্টার্ন রিফাইনারির বার্ষিক ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিশোধনের সক্ষমতা রয়েছে। দ্বিতীয় ইউনিট বাস্তবায়িত হলে বছরে আরও ৩০ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিশোধন করা সম্ভব হবে।

প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা। ২০১৬ সালে কয়েক দফা সংশোধনের পর ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ১৬ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা। প্রকল্পের ফিড কন্ট্রাক্টর হিসেবে ফ্রান্সের টেকনিপকে নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটি প্রকল্পের নকশা প্রণয়ন করে। প্রকল্প ব্যবস্থাপনা পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ পায় ভারতের প্রতিষ্ঠান ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্ডিয়া লিমিটেড (ইআইএল)। ২০১৬ সালের ১৯ এপ্রিল প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি করে বিপিসি। কিন্তু এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পের মূল কাজ শুরু করা যায়নি।

আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে

এদিকে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে প্রকল্পের ব্যয়ও। ২০২২ সালের শেষ দিকে প্রকল্প ব্যয় সংশোধন করে নির্ধারণ করা হয় ২৩ হাজার ৫৮ কোটি ৯৩ লাখ ৯২ হাজার টাকা। ২০২৩ সালের অক্টোবরে প্রকল্প প্রস্তাব আবার সংশোধন করে ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ২৩ হাজার ৭৩৬ কোটি ১০ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। এর মধ্যে ৭০ শতাংশ সরকারি অর্থায়ন এবং ৩০ শতাংশ বিপিসির নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়। পরে সর্বশেষ ২০২৫ সালে প্রকল্পটির ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ৩১ হাজার কোটি টাকা।

Scroll to Top