চির উন্নত তব শির | চ্যানেল আই অনলাইন

বিংশ শতাব্দীর সূচনা কাল- প্রায় দুশো বছর ধরে ব্রিটিশ রাজের শাসন দমনে বাঙালি দাসত্ব মনোভাবাপন্নতেই বেশি অভ্যস্ত। নিজের অজান্তেই হীনম্মন্যতায় ভুগছে, ধর্মান্ধতা ও কুসংস্কারে আচ্ছন্ন সমাজ। ধর্ম বিদ্বেষ ও শ্রেণীবৈষম্য বা জাতভেদের অজুহাতে এক শ্রেণী অনায়াসে নিপীড়ন ও লাঞ্ছিত করছে আরেক শ্রেণীকে। সেই সময় তার লেখনীর অভূতপূর্ব সৃষ্টিশীলতায় অশিক্ষার অন্ধকারে ঘুমিয়ে থাকা জাতিকে জাগিয়ে তুলতে পুবাকাশে প্রথম সূর্যোদয়ের আলোর রেখার মতো দেখা দিলেন এক ক্ষণজন্মা ধূমকেতু- কাজী নজরুল ইসলাম।

বিংশ শতাব্দীর অসম্ভবের সম্ভাবনার যুগে বিস্ময়কর কবিতা, কাজী নজরুল ইসলাম বিরচিত বিদ্রোহী। ২২ বছর সাত মাস বয়সের এক তরুণ কবি বিদ্রোহীর মতো অপূর্ব প্রাণবন্ত দুঃসাহসিক কবিতা লিখতে পারে এটা ছিল বিস্ময়কর ব্যাপার। এই কবিতা একসঙ্গে মোসলেম ভারত ও বিজলীতে প্রকাশিত হয়েছিল। কবিতাটি প্রকাশিত হবার সঙ্গে সঙ্গে নজরুলের খ্যাতি বাঙালি সমাজে বিশেষত তরুণ সমাজে জাগিয়েছিল অদম্য আবেগ উন্মাদনা।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জোড়াসাঁকোর বাড়িতে গিয়ে নজরুল ইসলাম গুরুদেবের সামনে দাঁড়িয়ে অঙ্গভঙ্গি সহকারে বিদ্রোহী কবিতাটি তাঁকে শোনানোর পর বিস্ময়ে নজরুলের মুখের দিকে চেয়ে রইলেন রবীন্দ্রনাথ। তারপর ধীরে ধীরে কাজীকে বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে বললেন, আমি মুগ্ধ হয়েছি তোমার কবিতা শুনে। তুমি যে বিশ্ববিখ্যাত কবি হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তোমার কবিতায় জগৎ আলোকিত হোক ভগবানের কাছে এই প্রার্থনা করি। বিদ্রোহী কবিতাটি মাঘ সংখ্যা ‘প্রবাসী’সহ পরবর্তীতে ছাপা হয় আরো কয়েকটি পত্রিকায়।

কবিতাটির প্রথম প্রকাশ প্রসঙ্গে কবি খান মঈনুদ্দিন লিখেছেন, ‘মনে আছে, সেদিন আমাদের তরুণ মনে কত আবেগ, কি উদ্দামতা আলোড়ন জেগেছিল! সারা বাংলাদেশ যেন আনন্দে উত্তেজনায় চঞ্চল হয়ে উঠেছিল। পথে, ঘাটে, রেস্তোরাঁয়, চায়ের বৈঠকে শুধু এই কবিতারই আলোচনা চলছিল। তরুণ সমাজ তো বিদ্রোহীর ভাষায় বাক্যালাপ শুরু করে দিল। সকলের ভিতরে সেই মনোভাব ‘আমি বেদুইন আমি চেঙ্গিস, আমি আপনারে ছাড়া করিনা কাহারে কুর্নিশ’।’

বিদ্রোহী কবিতা বাংলার যুবসমাজকে যেমন অনুপ্রাণিত করেছিল, তেমনি বিপ্লবীদের কণ্ঠে দিয়েছিল ভাষা এবং মানুষের মনে জাগিয়েছিল সামাজিক ও রাজনৈতিক চেতনা।

কবি বুদ্ধদেব বসু বিদ্রোহী কবিতা সম্পর্কে লিখেছেন, ‘একথা সত্য যে রবীন্দ্রনাথের পরে বাংলা ভাষায় নজরুলই প্রথম মৌলিক কবি। তিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে রবীন্দ্রনাথের পথ ছাড়াও অন্য পথ বাংলা কবিতায় সম্ভব।’

কবি প্রেমেন্দ্র মিত্রও বিদ্রোহী কবিতা প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘পূর্বের কিছু রচনা রসিকজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও বিদ্রোহী কবিতাতেই নজরুল সমস্ত সাহিত্য জগতের কাছে সচকিত স্বীকৃতি যেন সবলে আদায় করে নেন। প্রাপ্য বিচারে বিদ্রোহীর মূল্য সকলের কাছে সমান নাও হতে পারে, কিন্তু তদানীন্তন যুগমানসকে প্রথম এই কবিতার মধ্যে প্রতিবিম্বিত করেছে, একথা বোধহয় কেউ অস্বীকার করবেন না।’

বিদ্রোহী কবিতাটি লেখা হয়েছিল ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে, কলকাতায় ৩/৪ সি তালতলা লেনের বাড়ির একটি ঘরে। সেখানে কমরেড মুজাফফার আহমেদ ও নজরুল ইসলাম এক ঘরে থাকতেন। নজরুল প্রথম বিদ্রোহী কবিতা লিখেছিলেন রাত্রে, পেন্সিল দিয়ে। কারণস্বরূপ মুজাফফর আহমেদ জানিয়েছিলেন, ‘এইসময় নজরুল কিংবা আমার কারোরই ফাউন্টেন পেন ছিল না। দোয়াতে বারে বারে কলম ডোবাতে গিয়ে তাঁর হাত ও মন তাল রাখতে পারবে না এই ভেবেই সে কবিতাটি প্রথমে পেন্সিলে লিখেছিলো ও ভোরবেলা আমায় শুনিয়েছিল।’

এই কবিতা সম্পর্কে কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের মতামত জানা যায় সজনীকান্ত দাসের আত্মস্মৃতি থেকে। তিনি লিখেছেন, ‘নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা মনে লইয়া একদিন বিকেলে মফঃস্বলিয় মূঢ়তাসহ, ভয়ে সত্যেন্দ্রনাথের সম্মুখ দাঁড়ালাম এবং সংকোচে মরিয়া হইয়া শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহী সম্বন্ধে আমার বিদ্রোহ ঘোষণা করলাম। বলিলাম, ছন্দের দোলা মনকে নাড়া দেয় বটে, ‘আমি’র এলোমেলো প্রশংসা তালিকার মধ্যে ভাবের কোনো সামঞ্জস্য না পাইয়া মন পীড়িত হয়। ‘এবিষয়ে আপনার মতামত কি?’ প্রশ্ন শুনে বোধহয় সত্যেন্দ্রনাথ একটু অবাক হয়েছিলেন। পরে একটু হেসে বললেন, ‘কবিতার ছন্দের দোলা যদি পাঠকের মনকে নাড়া দিয়ে ভাবের ইঙ্গিত দেয়, তাহলেই কবিতা সার্থক।’

বিদ্রোহী কবিতার জন্য নিরবচ্ছিন্ন প্রশংসা ও অভিনন্দন নজরুলের ভাগ্যে জোটেনি। নজরুলের সাফল্য খ্যাতিতে ঈর্ষান্বিত হয়ে কেউ কেউ সমালোচনায় মুখর হন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন কবি মোহিতলাল মজুমদার। প্রথমে নজরুলের ‘শাত—ইল—আরব, বোধন, নিকটে কবিতার প্রশংসা করে মোসলেম ভারতে চিঠি লিখেছিলেন। বিদ্রোহী প্রকাশিত হবার পর তিনি প্রচার করে বেড়াতে লাগলেন, তাঁর লেখা ‘আমি’ প্রবন্ধের ভাবসম্পদ নিয়ে বিদ্রোহী রচিত হয় এবং ঋণ স্বীকার না করে তা ছাপা হয়েছে।

‘শনিবারের চিঠি’ পূজা সংখ্য্যার ‘কামস্কাতকিয়’ ছন্দে সজনীকান্ত দাসের ‘ব্যাঙ’ কবিতাটি ছাপা হয়…যেটি বিদ্রোহীর প্যারোডি।

আমি ব্যাঙ, লম্বা আমার ঠ্যাং

ভৈরব রভসে বরষা আসিলে

ডাকি যে ঘ্যাঙোর গ্যাং।

আমি সাপ, ব্যাঙেরে উগলিয়া খাই।

আমি বুক দিয়ে হাঁটি

ইঁদুর ছুঁচোর গর্তে ঢুকিয়া যাই।

নজরুল যখন হুল ফোটানো বিদ্রুপাত্মক প্যারোডি শুনলেন, তিনি খুব মজা পেলেন। হেসে গড়িয়ে পড়লেন। তাঁর স্মৃতিশক্তি ছিল অসাধারণ। কয়েকবার পড়েই তিনি প্যারোডিটি আগাগোড়া মুখস্থ করে ফেললেন। তারপর প্রথম যেদিন সজনীকান্তের সঙ্গে তাঁর দেখা হলো, তিনি হাসতে হাসতে হাত বাড়িয়ে ওনাকে জড়িয়ে ধরলেন এবং তাঁর স্বভাবসিদ্ধ প্রাণখোলা হাসি হেসে নজরুল তাঁকে পুরো প্যারোডিটি আবৃত্তি করে শোনালেন। হেসে সজনীকান্তের মন থেকে বিদ্বেষের বাষ্পটুকু উড়িয়ে দিলেন। সেদিন থেকে তাঁদের দুজনের প্রগাঢ় বন্ধুত্ব, তা যে না দেখেছে সে বিশ্বাস করবে না। শুধুমাত্র নজরুল ইসলামের পক্ষেই এমনটা করা সম্ভব হয়েছিল।

নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা নিয়ে যারা কটাক্ষ করেছিলেন তাদের রবীন্দ্রনাথ ব্যাখ্যা করেছিলেন, ‘আমার বিশ্বাস, নজরুলের কবিতা পড়ে থাকলেও তার মধ্যে রূপ ও রসের সন্ধান করোনি। অবজ্ঞাভরে চোখ বুলিয়েছো মাত্র। আমি যদি আজ তরুণ হতাম, তাহলে আমার কলমেও ওই সুর বাজত।’ তিনি আরো বলেন, ‘জনপ্রিয়তা কাব্য বিচারের স্থায়ী নিরিখ নয়। কিন্তু যুগের মনকে যা প্রতিফলিত করে, তা শুধু কাব্য নয়, মহাকাব্য।’

নজরুলের প্রতি রবীন্দ্রনাথের অন্তরের স্নেহ ও স্বীকৃতির প্রমাণ ধূমকেতু পত্রিকায় নজরুলকে লেখা তাঁর বাণী, যা ছিল নজরুলের প্রতি তাঁর রাজনীতিক আশীর্বাদ। রবীন্দ্রকাব্যে যা একটি ব্যতিক্রমী সংযোজন। পরে কবিগুরু নজরুল জেলে থাকাকালীন তাকে ‘বসন্ত’ গীতিনাট্য উৎসর্গ করায়, যারা মৌমাছির মতো রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে থাকতেন, তারা কবির এই কাজে খুশি হননি। নজরুলকে কটাক্ষ করে তারা লিখলেন,

‘বসন্ত দিলো কবি, তাইতো হয়েছো কবি।’

গোলাম মোস্তফা লিখলেন —

ওগো বীর

সংযত করো, সংহত করো

উন্নত তব শির।

বাঁধন কারার কাঁদন কাঁদিয়া

বিদ্রোহী হতে সাধ যায়?

সে কি সাজে রে পাগল সাজে তোর?

আপনার পায়ে দাঁড়াবার মতো

কতটুকু জোর আছে তোর?

কবি কাজী নজরুল ইসলাম, সৌভাগ্যক্রমে যিনি আমার ঠাকুর্দা, এতো বিতর্কের উর্ধে গিয়ে তাঁর বিদ্রোহী কবিতা সম্পর্কে বলেছেন—

‘বিদ্রোহীর জয়তিলক আমার ললাটে অক্ষয় হয়ে গেল আমার তরুণ বন্ধুদের ভালোবাসায়। একে অনেকেই কলঙ্কতিলক বলে ভুল করেছেন। কিন্তু আমি করিনি। বেদনাসুন্দরের গান গেয়েছি বলেই কি আমি সত্যসুন্দরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছি? আমি বিদ্রোহ করেছি, বিদ্রোহের গান গেয়েছি অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অত্যাচারের বিরুদ্ধে, যা মিথ্যা কলুষিত, পচা, পুরাতন সেই মিথ্যা সনাতনের বিরুদ্ধে, ধর্মের নামে ভন্ডামি ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে। হয়তো আমি সব কথা মুলায়েম করে বলতে পারিনি। তলোয়ার লুকিয়ে তার রুপোর খাপের ঝকমকানিটাকেই দেখাইনি। এই তো আমার অপরাধ? এরই জন্য তো আমি বিদ্রোহী? আমি এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছি, সমাজের সকল কিছু কুসংস্কারের বিধিনিষেধের বেড়া অকুতোভয়ে ডিঙিয়ে গেছি, এর দরকার ছিল মনে করে।’

নজরুলের ওপর সবচেয়ে বড় অভিযোগ ছিল, তাঁর কাব্য কালোত্তীর্ণ ও মনোত্তীর্ণ হয়ে চিরন্তন আবেদনে ভাস্বরিত হয়নি-কোনো এক সময় তাঁর সাহিত্যের আবেদন ফুরিয়ে যাবে। তাই তিনি বলে গেছেন—

রক্ত ঝরাতে পারি না তো একা

তাই লিখে যাই এ রক্তলেখা

বড় কথা, বড় ভাব আসে নাকো মাথায় বন্ধু, বড়ো দুখে

অমর কাব্য তোমরা লিখিও বন্ধু, আছো যারা সুখে।

কিন্তু আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, যতদিন পর্যন্ত পৃথিবীতে অন্যায় অত্যাচার শোষণ উৎপীড়ন অসাম্য দূর না হবে ততদিন পর্যন্ত নজরুল কাব্যের আবেদন ফুরাবে না। নজরুলের কাঙ্খিত জাতিভেদ ধর্মভেদহীন শ্রেণীহীন সুন্দর সমাজ যেদিন প্রতিষ্ঠিত হবে, হিংসা গ্লানি ও বিদ্বেষ যেদিন সমাজ থেকে দূর হবে সেদিন নজরুল কাব্যের আবেদন ফুরিয়ে গেলেও আপত্তি নেই। সেদিন বিদ্রোহী প্রেমিক কবি আমার দাদু নজরুলের আত্মা শান্তি পাবে। তিনি সদর্পে উদাত্ত কণ্ঠে আবারো বলে উঠবেন—

বলো বীর
বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা
চির উন্নত মম শির।

Scroll to Top