খাল কেটে কুমির বাগধারার জন্মকথা | চ্যানেল আই অনলাইন

খাল কেটে কুমির বাগধারার জন্মকথা | চ্যানেল আই অনলাইন

বাংলা ভাষায় একটি বহুল ব্যবহৃত বাগধারা “খাল কেটে কুমির আনা”। কথাটা আমরা প্রায়ই শুনি বা বলি যখন কেউ নিজের হাতেই নিজের বিপদ ডেকে আনে। কিন্তু এই বাগধারার পেছনে কী গল্প? কেনই বা খাল আর কুমির এই দুইয়ের মিলনে তৈরি হলো এমন শক্তিশালী এক ভাষাগত প্রতীক?

বাংলা একাডেমির অভিধান অনুযায়ী, “খাল কেটে কুমির আনা” বলতে বোঝায়: নিজের উদ্যোগে এমন কিছু করা, যার ফলে নিজের বা সমাজের জন্য বিপদ সৃষ্টি হয়।

অর্থাৎ সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে উল্টো বড় বিপদ ডেকে আনা।

এই বাগধারার সম্ভাব্য উৎস কী? কোনো লোকজ অভিজ্ঞতা কি এর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত?

বাংলার নদীমাতৃক ভূগোলেই এই বাগধারার শিকড় খুঁজে পাওয়া যায়। একসময় গ্রামবাংলায় কৃষি ও নৌ-চলাচলের সুবিধার জন্য মানুষ নিজেরাই ছোট ছোট খাল কেটে নদীর সঙ্গে সংযোগ তৈরি করত।

কিন্তু সেই খাল যদি বড় নদীর সঙ্গে যুক্ত হতো, তখন অনেক সময় নদীর কুমির বা অন্য হিংস্র জলজ প্রাণী সেই পথ ধরে গ্রামে ঢুকে পড়ত। ফলে যে খাল মানুষ কেটেছিল সুবিধার জন্য, সেটিই হয়ে উঠত বিপদের পথ।

লোকমুখে তখন হয়ত বলা হতো: খাল কেটেই তো কুমির ঢুকিয়েছ! সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই কথাই বাগধারায় রূপ নেয়।

হয়ত তখন কেউ রচনা করেছিলেন এমন কোনো ছড়া:

“খাল কেটেছিল গ্রামের মানুষ
পানির পথে সুখের আশ,
জোয়ার এল নদীর বুকে
খালে দিলো নতুন বাস।

কিন্তু স্রোতে ভেসে এলো
দাঁতাল এক কুমির হঠাৎ
সুখের খালই হলো পরে
নতুন করে ভয়ের আবাদ।

তাই তো বলে বুদ্ধিমানরা
কাজের আগে ভাবো ধীর
নিজের হাতে বিপদ ডেকে
খাল কেটো না কুমির ধীর।

এই লোককথার কোনো প্রামাণ্য ইতিহাস কি আছে?

ভাষাবিদদের মতে, এই বাগধারার নির্দিষ্ট কোনো লিখিত জন্মকাহিনি নেই। এটি মূলত লোকজ অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি প্রবাদ। বাংলার দক্ষিণাঞ্চল, বিশেষ করে সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকাগুলোতে নদী, খাল আর কুমির ছিল বাস্তব জীবনের অংশ। সেই বাস্তবতাই ভাষার ভাণ্ডারে এনে দিয়েছে এই তীক্ষ্ণ বাগধারা।

আজকের সমাজেও এই বাগধারার প্রাসঙ্গিকতা কমেনি। যেমন; ভুল নীতির কারণে অর্থনৈতিক সংকট/ অপরিকল্পিত উন্নয়ন প্রকল্প/ প্রযুক্তি ব্যবহার করতে গিয়ে নতুন বিপদ তৈরি করা

উন্নয়নবিদরা তাই বলেন: “বাংলা বাগধারার শক্তি এখানেই, দুটি সাধারণ শব্দ দিয়ে পুরো সমাজের অভিজ্ঞতা বলা যায়। ‘খাল কেটে কুমির আনা’ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, উন্নয়ন বা সিদ্ধান্ত– যাই হোক, তা যেন দূরদর্শিতা ছাড়া না হয়।”

মনে রাখতে হবে বাংলা বাগধারা শুধু ভাষার অলংকার নয়। এগুলো আমাদের সমাজ, ইতিহাস ও অভিজ্ঞতার প্রতিফলন। “খাল কেটে কুমির আনা” সেই ধরনেরই একটি বাগধারা, যা শতাব্দীর লোকজ জ্ঞানকে ছোট্ট একটি বাক্যে বন্দী করেছে।

Scroll to Top