কোরআনে চুমু দিয়ে ইরানের যাত্রা শুরু

কোরআনে চুমু দিয়ে ইরানের যাত্রা শুরু

ভিসা জটিলতা ও রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই বিশ্বকাপ খেলতে মেক্সিকো পৌঁছেছে ইরান জাতীয় ফুটবল দল। মেক্সিকোর উদ্দেশে তুরস্ক ছাড়ার আগে ইরানি ফুটবলারদের কোরআনে চুমু দেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র সীমান্তবর্তী মেক্সিকোর শহর তিহুয়ানায় রোববার স্থানীয় সময় ভোর ৫টায় অবতরণ করে ইরান দল। এর আগে তিন সপ্তাহ তুরস্কে অনুশীলন করেছে তারা।

সেখান থেকেই রাতভর ফ্লাইটে মেক্সিকোতে পৌঁছায় দলটি। মেক্সিকো যাত্রার আগে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, বিমানে ওঠার আগে পবিত্র কোরআনে চুমু দিচ্ছেন ইরানের ফুটবলাররা।
তিহুয়ানা বিমানবন্দরে ছোট একটি সমর্থকগোষ্ঠী উষ্ণ অভ্যর্থনা জানায় ‘টিম মেল্লি’কে। বিমানবন্দর থেকে খেলোয়াড়দের বহনকারী বাস বেরিয়ে যাওয়ার সময় প্রায় এক ডজন সমর্থক তাদের অভিবাদন জানান।

তাদের মধ্যেই ছিলেন তিহুয়ানার বাসিন্দা ও পেশায় মেকানিক সাদেগ গালাভি।
এএফপিকে গালাভি বলেন, ‘তাদের দেখে আমি খুব রোমাঞ্চিত।’

ইরান দলকে স্বাগত জানাতে ভোরে ঘুম থেকে উঠতে দ্বিধা করেননি ত্রিশোর্ধ্ব গালাভি। ইরানের জাতীয় দলের সাদা জার্সি পরে তিনি বলেন, ‘আমার জাতীয় দল আমার শহরে আসছে। তাদের স্বাগত জানাতে এখানে থাকা আমার পক্ষ থেকে খুব ছোট একটি কাজ।’

ইরানের জন্য এই অভ্যর্থনা ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ বিশ্বকাপ শুরুর আগেই কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েছে দলটি। খেলোয়াড়রা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ এবং লস অ্যাঞ্জেলেস ও সিয়াটলে গ্রুপ পর্বের ম্যাচ খেলতে প্রয়োজনীয় ভিসা পেলেও প্রতিনিধি দলের সবাই ভিসা পাননি।

প্রায় ১৫ জন কর্মকর্তা ভিসা পাননি বলে জানা গেছে। তাদের মধ্যে আছেন ইরান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মেহদি তাজও। তিনি আগে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসে দায়িত্ব পালন করেছেন। এই বাহিনীকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে ওয়াশিংটন।

ভিসা জটিলতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে গালাভি বলেন, ‘আমার কাছে এর কোনো মানে হয় না। খেলাধুলা শান্তির প্রতীক হওয়ার কথা। তাই যখন আপনি রাজনীতি ও খেলাধুলা একসঙ্গে মেশাবেন, তখন সেটি কাজ করে না।’

কোরআনে চুমু দিয়ে ইরানের যাত্রা শুরু

যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার যৌথ আয়োজনে হতে যাওয়া এবারের বিশ্বকাপে ইরান দলকে ঘিরে বিতর্কের নতুন অধ্যায় এই ভিসা ইস্যু। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের ওপর ইসরায়েলি ও মার্কিন হামলা শুরুর পর থেকেই ইরানের বিশ্বকাপ অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে এর আগে কখনো এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি, যেখানে কোনো অংশগ্রহণকারী দেশ আয়োজক দেশের সঙ্গে যুদ্ধাবস্থায় থেকেও সেই টুর্নামেন্টে খেলতে যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় তেহরানও পরিষ্কার করেনি, তাদের দল বিশ্বকাপে খেলতে পারবে কি না।

শেষ পর্যন্ত ফিফার অবস্থানই প্রাধান্য পায়। তবে দুই সপ্তাহ আগে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় ইরান ফুটবল ফেডারেশন জানায়, দলটি আর যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনার টুসনে থাকবে না। এর বদলে তারা বেস ক্যাম্প সরিয়ে নেয় মেক্সিকোর তিহুয়ানায়।

মাঠের বাইরের এত ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে ইরান কি নিউজিল্যান্ড, বেলজিয়াম ও মিসরের বিপক্ষে নিজেদের সেরা ফুটবল খেলতে পারবে? প্রথমবারের মতো কি তারা বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব পেরোতে পারবে? ইরান-আমেরিকান সমর্থক সিনা মোগাদামের এ নিয়ে কোনো সংশয় নেই।

ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগো থেকে সীমান্ত পেরিয়ে তিহুয়ানায় আসা মোগাদাম বলেন, ‘ইরানের ইতিহাস হাজার বছরের পুরোনো। এমন ঘটনা আমাদের আরও শক্তিশালী করে; দলকে অস্থির করে না।’

নিজেকে ‘দেশপ্রেমিক’ পরিচয় দেওয়া অবসরপ্রাপ্ত মোগাদাম বিশাল ইরানি পতাকা নাড়ছিলেন। নকআউট পর্বে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মুখোমুখি লড়াই দেখার আশাও প্রকাশ করেন তিনি। এমন ম্যাচ হলে সেটি টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক আলোচনায় পরিণত হতে পারে।

খেলোয়াড়দের বাস দৃষ্টির বাইরে চলে যাওয়ার সময় হাসতে হাসতে তিনি বলেন, ‘আশা করি, তারা যুক্তরাষ্ট্র দলকে হারাবে।’

ইরান দলকে মেক্সিকান পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর ভারী অস্ত্রধারী বড় বহর নিরাপত্তা দিয়ে নিয়ে যায়। দলের হোটেল এবং অনুশীলন ভেন্যু এস্তাদিও ক্যালিয়েন্তের প্রবেশপথেও নেওয়া হয়েছে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

এই নিরাপত্তা উপস্থিতি কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে হোসেইন নিকইয়ারকে। ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে রাতভর গাড়ি চালিয়ে ইরান দলকে স্বাগত জানাতে এসেছিলেন তিনি।

চল্লিশোর্ধ্ব এই প্রকৌশলী বলেন, ‘লস অ্যাঞ্জেলেসের চেয়ে এখানে থাকা তাদের জন্য নিরাপদ। কারণ এলএ-তে অনেক ইরানি আছেন, যারা রাজতন্ত্রপন্থী এবং সরকার পতন চান।’

লস অ্যাঞ্জেলেসে ইরানের ম্যাচ দেখার টিকিটও কিনেছেন নিকইয়ার। তবে বিশ্বকাপ শুরুর আগেই তিক্ততা লুকাতে পারছেন না তিনি।

তিনি বলেন, ‘ফিফা দাবি করে, বিশ্বকাপে রাজনীতি নেই; সবই ফুটবল ও ফেয়ার প্লে নিয়ে। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখছি, সেটি সত্য নয়।’

Scroll to Top