ওজন কমাতে চীনের তরুণ প্রজন্ম খাচ্ছে প্লাস্টিক! | চ্যানেল আই অনলাইন

ওজন কমাতে চীনের তরুণ প্রজন্ম খাচ্ছে প্লাস্টিক! | চ্যানেল আই অনলাইন

ডিটক্স জুস থেকে শুরু করে চরম উপবাস ওজন কমানোর ট্রেন্ড যেন কখনও থামে না। প্রতি কয়েক মাস পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজির হয় নতুন কোনো পদ্ধতি। কেউ দ্রুত চর্বি কমানোর প্রতিশ্রুতি দেয়, কেউ বলে মেটাবলিজম রিসেট হবে। বেশিরভাগ ট্রেন্ডের মূল বার্তা একটাই কম খান, চিকন দেখান, ভালো থাকুন। তবে দ্রুত ওজন কমানোর দৌড়ে অনেক সময় যুক্তি পিছিয়ে পড়ে।

সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।

এবার অনলাইনে আলোচনায় এসেছে এক অদ্ভুত নতুন ট্রেন্ড, বিশেষ করে চীনের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘প্লাস্টিক খাওয়া’ ট্রেন্ড। চীনের টিকটকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ভিডিওগুলো ভাইরাল হচ্ছে, এমনকি এক্স-এও ছড়িয়ে পড়েছে এও ভিডিও। ধারণাটি শুনতে অদ্ভুত হলেও অনেক তরুণ-তরুণী এটি অনুসরণ করছেন বলে জানা যাচ্ছে।

কী এই ‘প্লাস্টিক খাওয়া’ ট্রেন্ড?

এআই চ্যাটবট গ্রোক-এর তথ্য অনুযায়ী, এই ট্রেন্ডটি ‘প্লাস্টিক ইটিং’ বা ‘ক্লিং র‍্যাপ ডায়েট’ নামে পরিচিত। এর লক্ষ্য হলো ক্যালোরি গ্রহণ না করেই মস্তিষ্ককে তৃপ্তির অনুভূতি দেওয়া।

পদ্ধতিটি হলো, মুখে প্লাস্টিক র‍্যাপ রেখে তার ভেতর দিয়ে খাবার চিবানো, এরপর খাবারটি ফেলে দেওয়া। ধারণা করা হয়, এতে ক্ষুধা কমে এবং ওজন কমাতে সাহায্য করে। তবে এর কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা প্রমাণিত নয়। বরং এতে শ্বাসরোধসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকতে পারে।

এই ট্রেন্ডের পেছনের যুক্তি হলো, চিবানোর মাধ্যমে মস্তিষ্ক স্বাদ ও টেক্সচার অনুভব করে, ফলে মনে হয় খাবার খাওয়া হয়েছে। কিন্তু খাবার গিলে না ফেলায় ক্যালোরি শরীরে যায় না। অনেকের কাছে এটি দ্রুত ওজন কমানোর শর্টকাট মনে হতে পারে।

প্লাস্টিক র‍্যাপের মাধ্যমে খাবার চিবানোর এই প্রবণতা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক মানবদেহে নানা ক্ষতি করতে পারে।

সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো হলো:

১. পরিপাকতন্ত্রের ক্ষতি

খাবার বা পানির মাধ্যমে মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে প্রবেশ করলে তা পরিপাকতন্ত্রে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে। পেটব্যথা, গ্যাস, বমিভাব, বমি ও মলত্যাগের অভ্যাসে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। খাবার ফেলে দিলেও ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা মুখ ও পরিপাকতন্ত্রে ঢুকে যেতে পারে।

২. শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যা

মুখের কাছে প্লাস্টিক ব্যবহারে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে ঢোকার ঝুঁকি বাড়ে। এতে কাশি, হাঁচি, শ্বাসকষ্ট, অবসাদ ও মাথা ঘোরার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

৩. হরমোনের ভারসাম্যহীনতা

মাইক্রোপ্লাস্টিক হরমোন উৎপাদন ও বিপাকে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এতে বিসফেনল এ (বিপিএ)-এর মতো ক্ষতিকর রাসায়নিক থাকতে পারে, যা বিপাকজনিত রোগ, বন্ধ্যাত্ব, গর্ভপাত ও জন্মগত ত্রুটির সঙ্গে সম্পর্কিত।

৪. দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ

গবেষণায় দেখা গেছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস বাড়ায় এবং লিভার, অন্ত্র ও ফুসফুসে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ বিভিন্ন জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

৫. রোগপ্রতিরোধ ও স্নায়ুতন্ত্রে প্রভাব

মাইক্রোপ্লাস্টিক ইমিউন প্রতিক্রিয়া সক্রিয় করতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। প্রাণী গবেষণায় বিভিন্ন অঙ্গে প্রদাহের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

মানসিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

শুধু শারীরিক নয়, এই ধরনের ট্রেন্ড মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।

১. খাবারের সঙ্গে অস্বাস্থ্যকর সম্পর্ক

খাবার চিবিয়ে ফেলে দেওয়া স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাস নয়। এটি ধীরে ধীরে খাওয়ার বিষয়ে ভয় ও অপরাধবোধ তৈরি করতে পারে, যা ইটিং ডিসঅর্ডারের লক্ষণ হতে পারে।

২. শরীর নিয়ে উদ্বেগ বৃদ্ধি

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিখুঁত শরীরের চাপ আগে থেকেই রয়েছে। চরম ডায়েট ট্রেন্ড দেখে তরুণরা নিজেকে অপর্যাপ্ত মনে করতে পারেন, যা আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয়।

৩. খাবার নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা

খাওয়াকে উপভোগের বদলে নিয়ন্ত্রণের বিষয় বানালে সারাক্ষণ ক্যালোরি ও ওজন নিয়ে ভাবনা বাড়তে পারে। এতে পড়াশোনা, কাজ ও সামাজিক জীবন ব্যাহত হতে পারে।

৪. মুড সুইং ও খিটখিটে মেজাজ

পর্যাপ্ত পুষ্টি না পেলে রক্তে শর্করার মাত্রা কমে যেতে পারে, ফলে মেজাজের পরিবর্তন, শক্তির ঘাটতি ও মনোযোগের সমস্যা দেখা দেয়।

৫. ইটিং ডিসঅর্ডারের ঝুঁকি

বারবার খাবার চিবিয়ে ফেলে দেওয়া অভ্যাসে পরিণত হতে পারে, যা ভবিষ্যতে বুলিমিয়া বা অন্যান্য খাওয়াজনিত সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়।

দ্রুত সমাধান কেন কাজ করে না

চিবিয়ে ফেলে দেওয়া দীর্ঘমেয়াদে ওজন কমাতে কার্যকর এমন শক্ত প্রমাণ নেই। বরং এতে পরে অতিরিক্ত ক্ষুধা তৈরি হতে পারে। শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি না পেলে ক্ষুধা-নিয়ন্ত্রণকারী হরমোন বেড়ে যায়, ফলে পরে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়।

‘প্লাস্টিক খাওয়া’ ট্রেন্ড এখন ভাইরাল। কিন্তু ভাইরাল মানেই নিরাপদ নয়। অনলাইনে দেখা যেকোনো চ্যালেঞ্জ বা ট্রেন্ড অনুসরণ করার আগে সচেতনভাবে ভাবা জরুরি।

ভিডিওটি দেখতে এই লিংকে ক্লিক করুণ https://url-shortener.me/DFUF

Scroll to Top