বাংলা সাহিত্যের প্রজ্ঞাবান কবি ও সম্পাদক, একুশে পদকপ্রাপ্ত সাহিত্যিক জাহানারা আরজু আর মারা গেছেন।
সোমবার ২ মার্চ ৯৪ বছর বয়সে নিজ বাসভবনে তিনি মারা গেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন।
১৯৩২ সালের ১৭ নভেম্বর ব্রিটিশ ভারতের ঢাকা জেলার মানিকগঞ্জের জাবরা গ্রামে মাতুলালয়ে তার জন্ম। বাবা আফিল উদ্দিন আহম্মদ চৌধুরী ও মা খোদেজা খাতুন। তার স্বামী ছিলেন দেশের সাবেক উপররাষ্ট্রপতি ও বিচারপতি নুরুল ইসলাম । জাহানারা আরজু ছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম মহিলা সাপ্তাহিক ‘সুলতানা’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাকালীন সম্পাদক। ১৯৪৯ সাল থেকে কবি সুফিয়া কামাল-এর সঙ্গে যৌথভাবে পত্রিকাটি সম্পাদনা করেন, যা নারী জাগরণ ও সাহিত্যচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ১৯৬৫ সালে রাইটার্স গিল্ডের পত্রিকা ‘পরিক্রম’-এ যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন তিনি। এছাড়া টিবি অ্যাসোসিয়েশনের পাক্ষিক ‘হেলথ বুলেটিন’-এর প্রধান সম্পাদক এবং সাহিত্যপত্রিকা ‘সেতুবন্ধন’-এর সম্পাদনার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। অষ্টম শ্রেণিতে পড়াকালেই হাতে লেখা পত্রিকা ‘অঞ্জলি মোর গুঞ্জরণী’ প্রকাশের মাধ্যমে তাঁর সাহিত্যচর্চার সূচনা। অবিভক্ত বাংলার কিংবদন্তি দুই ব্যক্তিত্ব এ কে ফজলুল হক ও কায়কোবাদ সেই পত্রিকায় আশীর্বচন লিখেছিলেন। তার প্রথম কবিতা ১৯৪৫ সালে ‘আজাদ’ পত্রিকার ‘মুকুলের মাহফিল’-এ প্রকাশিত হয়। এরপর নিয়মিতভাবে ‘সওগাত’, ‘মোহাম্মদী’, ‘বেগম’, ‘মিল্লাত’, ‘ইত্তেহাদ’সহ বিভিন্ন পত্রিকায় তাঁর লেখা প্রকাশিত হতে থাকে।
প্রকৃতি, প্রেম, মানুষ ও সমাজ ছিল তার কবিতার মূল সুর। সহজ-সরল ভাষা ও আবেগমাখা বর্ণনায় তিনি পাঠকের হৃদয়ে বিশেষ স্থান করে নেন। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে— নীলস্বপ্ন (১৯৬২), রৌদ্র ঝরা গান (১৯৬৪), সবুজ সবুজ অবুঝ মন, আমার শব্দে আজন্ম আমি, ক্রন্দসী আত্মজা, বাদল মেঘে মাদল বাজে, এবং শোণিতাক্ত আখর (১৯৭১)। বাংলা সাহিত্যে অসাধারণ অবদানের জন্য ১৯৮৭ সালে তিনি রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান একুশে পদক লাভ করেন। এছাড়া মোট ২৬টি সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হন।
তাদের চার সন্তান—বড় ছেলে মো. আশফাকুল ইসলাম (হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি), ছোট ছেলে প্রকৌশলী মোহাম্মদ জাহিনুল ইসলাম, বড় মেয়ে অধ্যাপিকা মেরিনা জামান এবং ছোট মেয়ে প্রয়াত লুবনা জাহান। নাতি-নাতনি, পুতি-পুতনি, অসংখ্য গুণগ্রাহী, অনুরাগী ও শুভাকাঙ্ক্ষী রেখে গেছেন তিনি।
বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে তার অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করা হয়েছে।



