
ইসলামাবাদ, ০২ অক্টোবর – আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বারবার নেওয়া বেলআউট ঋণ আর মিত্র রাষ্ট্রগুলোর দেওয়া আমানতের মেয়াদ বাড়িয়ে রাখা—এই দুটি ভঙ্গুর ভিত্তির ওপর এখন টিকে আছে পাকিস্তানের চরম সংকটময় অর্থনীতি। নিজস্ব টেকসই অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে না পেরে ভূরাজনৈতিক গুরুত্বকে কাজে লাগিয়ে মিত্র দেশগুলোর কাছ থেকে ঋণ জোগাড় করছেন দেশটির শাসকেরা।
পাকিস্তানের শীর্ষ সংবাদমাধ্যম ডন-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে এসব বিস্ফোরক ও চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে ধরেছেন দেশটির বিশিষ্ট রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ ও গবেষক ড. নিয়াজ মুর্তাজা।
পারভেজ মোশাররফের সেই মোক্ষম সুযোগ নষ্ট: ৪৫ বিলিয়ন ডলারের মাশুল
ড. নিয়াজ মুর্তাজার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, একবিংশ শতাব্দীতে অর্থনৈতিক ঘুরে দাঁড়ানোর সবচেয়ে বড় সুযোগটি হারিয়েছিলেন সাবেক সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি পারভেজ মোশাররফ।
৪৫ বিলিয়ন ডলারের প্রবাহ: ২০০১ সালের ৯/১১ হামলার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল সহায়তা, ঋণ পুনর্গঠন ও পোর্টফোলিও বিনিয়োগের মাধ্যমে ৪৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ পাকিস্তানে আসে।
বিলাসিতা ও রিয়েল এস্টেটে অপচয়: সেই বিপুল অর্থ শিল্পায়ন বা শক্তিশালী রপ্তানি ভিত্তি তৈরিতে না লাগিয়ে ব্যয় করা হয় অনাবশ্যক আমদানি, বিলাসিতা এবং আবাসন (রিয়েল এস্টেট) খাতে।
চলতি হিসাবের ধস: ফলে ২০০৮ সালে চলতি হিসাবের ঘাটতি জিডিপির ৮.২ শতাংশে গিয়ে ঠেকে, যা দেশকে মহা-সংকটে ঠেলে দেয়।
পরবর্তীতে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের (CPEC) আওতায় জ্বালানি ও যোগাযোগ খাতে ২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ আসলেও কোনো টেকসই রপ্তানি কাঠামো গড়ে ওঠেনি।
বিদেশি আমানতের ‘বিষাক্ত’ নির্ভরতা
ড. মুর্তাজার দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৬ সালে স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের মোট রিজার্ভের মাত্র ৩৬ শতাংশ ছিল বিদেশি রাষ্ট্রের আমানত। অথচ ২০২৩ সালের শুরুতে তা অবিশ্বাস্যভাবে লাফিয়ে পৌঁছায় ৬০০ শতাংশে!
বর্তমানে পাকিস্তানের কাঁধে যা জমা রয়েছে:
- আইএমএফের ঋণ: প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার
- সৌদি আরবের আমানত: ৮ বিলিয়ন ডলার
- চীনের আমানত: ৪ বিলিয়ন ডলার
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই আমানত বা ঋণগুলো দিয়ে কোনো কারখানা, রাজস্ব বা নতুন কর্মসংস্থান বাড়ে না; এগুলো নেওয়া হয় শুধুই দেউলিয়া হওয়া ঠেকানোর সাময়িক ‘মলম’ হিসেবে।
পাকিস্তানের উল্টো পথে বাংলাদেশ: তুলনামূলক চিত্র
পাকিস্তানের ভঙ্গুর পরিস্থিতির বিপরীতে বাংলাদেশ অর্থনীতিতে তুলনামূলকভাবে কতটুকু শক্ত অবস্থানে রয়েছে, তাও তুলে ধরেছেন ড. মুর্তাজা:
১. কোনো বিদেশি আমানত নেই: বাংলাদেশের অর্থনীতিকে কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখতে কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের সাময়িক আমানতের সাহায্য নিতে হয় না।
২. নগণ্য ঋণ নির্ভরতা: রিজার্ভের তুলনায় বাংলাদেশের আইএমএফ ঋণের পরিমাণ খুবই সামান্য।
৩. রপ্তানি আয়ের বিশাল ব্যবধান: যেখানে পাকিস্তানের বার্ষিক রপ্তানি আয় মাত্র ৩০ বিলিয়ন ডলারে থমকে আছে, সেখানে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় পৌঁছে গেছে প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলারে!
‘বেইলআউট স্টেট’ আর কতদিন?
ড. নিয়াজ মুর্তাজার মতে, পাকিস্তানের সামনে এখন দুটিই চরম কঠিন পথ খোলা রয়েছে:
ধীরগতির প্রবৃদ্ধি মেনে নেওয়া: যার কারণে দেশে মারাত্মক সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হবে।
আমদানিনির্ভর কৃত্রিম প্রবৃদ্ধি বাড়ানো: যা দেশকে দ্রুত ফের নতুন বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে ফেলবে।
উৎপাদন ও রপ্তানি না বাড়িয়ে কেবল বিদেশি সাহায্য ও ঋণের ওপর টিকে থাকা এই ‘বেইলআউট রাষ্ট্র’ আর কতদিন টিকবে—এখন সেটাই আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
এনএন/ ০২ অক্টোবর ২০২৬
পাকিস্তানের অর্থনীতি নিয়ে নিয়াজ মুর্তাজা কী বলেছেন?
ড. নিয়াজ মুর্তাজার মতে, পাকিস্তানের বৈদেশিক তারল্য আইএমএফ ঋণ এবং মিত্র রাষ্ট্রগুলোর আমানত বা রোলওভারের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল। তিনি রপ্তানিমুখী অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল থাকার বিষয়টি তুলে ধরেছেন।
পাকিস্তানের বর্তমান আইএমএফ কর্মসূচি কত বড়?
২০২৬ সালের ৮ মে IMF জানায়, পাকিস্তানের EFF ও RSF কর্মসূচির অধীনে মোট বিতরণ প্রায় ৪.৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
পাকিস্তানের রপ্তানি আয় কত?
Pakistan Bureau of Statistics-এর হিসাবে FY2025-26-এ পাকিস্তানের পণ্য রপ্তানি ছিল প্রায় ৩০.১৪ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশ FY2025-এ কত রপ্তানি করেছে?
Bangladesh Bank-এর তথ্য অনুযায়ী FY2025-এ বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি ছিল প্রায় ৪৩.৯৭ বিলিয়ন ডলার।
পাকিস্তানের বৈদেশিক রিজার্ভে মিত্র রাষ্ট্রের অর্থের ভূমিকা কী?
স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের প্রতিবেদনে সৌদি আরব, UAE ও চীনের আমানত বা ঋণসহ বিভিন্ন বৈদেশিক দায়ের উল্লেখ রয়েছে। এগুলি রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ হলেও দীর্ঘমেয়াদি রপ্তানি আয়ের সমতুল্য নয়।


