
ঢাকা, ৩১ মার্চ – কাঠামোগত দুর্বলতা, অসমাপ্ত সংস্কারকাজ এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপের কারণে আসন্ন জাতীয় বাজেট প্রণয়ন বর্তমান সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মানীয় ফেলো এবং বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এই মন্তব্য করেছেন। তার মতে বর্তমান সময়ে সরকারের সবচেয়ে বড় বাধা হলো সীমিত আর্থিক সক্ষমতা।
মঙ্গলবার রাজধানীর ধানমণ্ডিতে অবস্থিত সিপিডি কার্যালয়ে সিটিজেনস প্ল্যাটফর্ম ফর এসডিজি আয়োজিত বাজেট ঘিরে নাগরিক ভাবনা ও প্রত্যাশা শীর্ষক একটি প্রাক বাজেট মিডিয়া ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য জানান সরকার বর্তমানে কঠোর বাজেট সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা ক্রমশ কঠিন হচ্ছে।
তিনি আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা এবং ব্যয়ের ক্ষেত্রে সতর্কতার সঙ্গে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করার ওপর জোর দেন। বাস্তবতার সঙ্গে মিল রেখে ব্যয় পরিকল্পনা না সাজালে অর্থনীতিতে আরও বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।
বিগত সরকারের শেষ সময়ে নেওয়া পে স্কেল উদ্যোগকে বর্তমান সরকারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া একটি প্রলম্বিত দায় হিসেবে উল্লেখ করেন এই অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রে অন্যায্য। তাই বর্তমান সরকারের উচিত নিজস্ব উদ্যোগে একটি কমিশন গঠন করে এটি পুনর্বিবেচনা করা। এক্ষেত্রে আগের কমিশনের প্রতিবেদনকে কেবল সহায়ক হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে তবে তা বিনা প্রশ্নে গ্রহণ করার কোনো সুযোগ নেই।
পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে তিনি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। অবৈধভাবে স্থানান্তরিত এবং দেশ বিদেশে জব্দ হওয়া সম্পদ দ্রুত আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। ছোট অঙ্কের অর্থ ফেরত আসার উদাহরণ টেনে তিনি প্রশ্ন তোলেন বড় অঙ্কের অর্থ উদ্ধারে কেন দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।
রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির জন্য তিনি দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রশাসনিক জটিলতা অবসানের আহ্বান জানান।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন নির্বাচিত সরকারের জন্য প্রথম বছরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি না হলে মেয়াদের শেষ দিকে তা বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে।
এছাড়া কৃষি ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকির চাপ বৃদ্ধির আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি অদক্ষ খাতগুলো চিহ্নিত করে ভর্তুকি কাঠামো ঢেলে সাজানোর পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে ধাপে ধাপে নগদ প্রণোদনা কমানো, কর ছাড় সীমিত করা এবং করজাল বিস্তৃত করার কথা বলেন।
আসন্ন বাজেট প্রণয়নে তিনি চারটি প্রধান চাপের কথা উল্লেখ করেন। প্রথমত দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা এবং পূর্ববর্তী সরকারের অসম্পূর্ণ নীতির প্রভাব। দ্বিতীয়ত নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পাশাপাশি রাজস্ব ও ব্যয় ব্যবস্থাপনায় সংস্কার আনার তাগিদ। তৃতীয়ত সীমিত আর্থিক পরিসর ও অর্থায়নের সংকট। চতুর্থত রেমিট্যান্স, রপ্তানি আয়, বিদেশি বিনিয়োগ ও ঋণ পরিশোধের মতো বৈদেশিক খাতের লেনদেনে ভারসাম্যহীনতা।
এছাড়া ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং জ্বালানির বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে দেশের অর্থনীতি নতুন করে চাপে পড়ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। দেবপ্রিয়
ভট্টাচার্য বলেন বাংলাদেশ এখন এমন এক স্তরে রয়েছে যেখানে বাজেট প্রণয়নে বাস্তবসম্মত প্রত্যাশা নির্ধারণ করা অত্যন্ত জরুরি। স্বল্পমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হলে আসন্ন বাজেট অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে না।
এনএন/ ৩১ মার্চ ২০২৬





