দেড়শ’ বছরের পুরনো সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং (সিআরবি)। চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী সেই ভবনের পূর্ব দিকের সীমানালাগোয়া সড়কের ফুটপাত ধরে প্রতি মিনিটে অন্তত ১০ থেকে ১৫ জন মানুষ হাঁটাচলা করেন। সে হিসেবে এই ফুটপাত দিয়ে প্রতি ঘণ্টায় ৫শ’ থেকে ১ হাজার মানুষের আসা-যাওয়া। অথচ, সেই ব্যস্ততম ফুটপাতের আধা কিলোমিটার জায়গাতেই কিনা ৩৫টি মৃত্যুফাঁদ!
ম্যানহোলের ঢাকনা না থাকায় দিনে-দুপুরে সেই গর্তে পড়ে আহত হচ্ছেন অসংখ্য মানুষ। রাতের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। কেননা পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা না থাকায় যেকোনো সময় ঘটতে পারে বড় দুর্ঘটনা।
অথচ, এর কয়েক মিটার দূরেই শতবর্ষী বৃক্ষরাজির ছায়ায় ঘেরা শিরীষতলায় চলছে জমজমাট অমর একুশে বইমেলা। আর এই বইমেলাকে ঘিরে সিআরবিতে এখন প্রতিদিন গড়ে হাজারো মানুষের আনাগোনা। প্রায় ৫০ লাখ টাকা বাজেটের বইমেলার আয়োজন করলেও আধা কিলোমিটার জুড়ে ৩৫টি ম্যানহোলের ঢাকনা না থাকার বিষয়টি যেন নজর এড়িয়ে গেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক)।
মঙ্গলবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) ওই রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে দেখা যায় এমনই চিত্র। ব্যস্ত নগরী চট্টগ্রামের বাসিন্দাদের কাছে সবুজে মোড়ানো সিআরবি এলাকা যেন এক মানসিক প্রশান্তির স্থান। অথচ, সেই সিআরবির নিচে রেলওয়ে হাসপাতাল সড়কের অপর পাশের ফুটপাতে মাঝে মাঝেই আচমকা ম্যানহোলের ঢাকনা খোলা গর্তের ফাঁদে পড়ে ঘটছে নানা দুর্ঘটনা।
সরেজমিনে দেখা যায়, বইমেলা ছাড়াও প্রতিদিন ভোর হলে ফুটপাত ধরে সিআরবিতে প্রাতঃভ্রমণে আসেন নানা বয়সের মানুষ। দিনভর আড্ডা দিতে বা খেলাধুলায় মেতে থাকতে শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বয়স্করাও ছুটে আসেন এই সিআরবিতে। এখানে রয়েছে রেল কর্মকর্তাদের একটি আবাসিক এলাকাও। এছাড়া এই সড়ক দিয়ে যাতায়াত করে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী। তবে, ফুটপাতের প্রতি ১৫ মিটার পর পর ম্যানহোলের ঢাকনার ব্যবস্থা করা হলেও প্রায় এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ঢাকনাবিহীন ম্যানহোলগুলো এখন পরিণত হয়েছে মৃত্যুফাঁদে।

স্থানীয়দের ধারণা, সিআরবি যাওয়ার পথে ফুটপাতে থাকা ম্যানহোলগুলো খোলা থাকার একমাত্র কারণ চুরি। তবে, এই চুরি আটকাতে সিটি করপোরেশন যেন একেবারেই ব্যর্থ। জানা গেছে সিটি করপোরেশন যতবারই ম্যানহোলের ঢাকনাগুলো লাগিয়েছে ততবার চুরি হয়েছে। ফলে এই পথ ধরে রাতে কিংবা দিনে চলাচল করতে বেশ সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়।
পথচারীরা বলছেন, হাজারো মানুষের আনাগোনায় মুখরিত চট্টগ্রামের ফুসফুস খ্যাত সিআরবি নগরের অন্যতম ব্যস্ত জায়গা। এখানে হাসপাতাল, অফিস ও শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানসহ রয়েছে রেল কর্মকর্তাদের আবাসিক এলাকাও। তবে, ম্যানহোলের ঢাকনাগুলো না থাকায় বর্তমানে পথচারীরা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। দিনে উন্মুক্ত ম্যানহোলগুলো কিছুটা দেখা গেলেও রাতে সম্পূর্ণ ঝুঁকিতে থাকেন পথচারীরা।
নগরের কাজির দেউড়ি এলাকার বাসিন্দা কামরান চৌধুরী বলেন, ম্যানহোলগুলো খোলা থাকার একমাত্র কারণ চুরি। চোরেরা লোহার এই ঢাকনাগুলো ভেঙে নিয়ে যায়। এনিয়ে সিটি করপোরেশনের কঠোর হওয়া উচিত। ঢাকনাগুলো লাগানোর কিছুদিনের মধ্যেই চুরি হয়ে যায়। ফলে এই পথ ধরে রাতে কিংবা দিনে চলাচল করতে বেশ সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়। এছাড়া দিন দিন এই এলাকার ফুটপাত দখল করে নিচ্ছে কর্মহীন কিছু মানুষ। এজন্য ফুটপাতে হাঁটা দায় হয়ে গেছে। ওয়ার্ড কাউন্সিলরের প্রতি অনুরোধ, যতদ্রুত সম্ভব এই ম্যানহোলগুলোর ঢাকনা লাগিয়ে মানুষকে মৃত্যুর ঝুঁকি থেকে রক্ষা করুন। ঢাকনা চুরি বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেন।
বইমেলায় আসা হাটহাজারী এলাকার বাসিন্দা জাহিদ হাসান সবুজ বলেন, এই রাস্তা দিয়ে যখনই এসেছি, ঢাকনাগুলো খোলা থাকতে দেখেছি। যে কেউ যেকোনো সময় গর্তে পড়ে হাত-পা ভাঙতে পারেন। বড় দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে। শুনেছি, ঢাকনাগুলো চুরি হয়ে যায়। তাহলে সিটি করপোরেশন কী করে? তাদের কাজটা কী? বইমেলায় শিশুরা ও বয়োবৃদ্ধরা আসে। যদি কেউ কোন ক্ষতির সম্মুখীন হয়, এর দায়ভার কে নেবে?
স্থানীয় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ঢাকনাগুলো না থাকার কারণে প্রতিনিয়ত এই ফুটপাত দিয়ে আমাদেরকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। একটা দুইটা গর্ত না শুধু, এখানে অসংখ্য গর্ত। যেকোনো সময় মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। রাতেও পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নেই এখানে। ওয়ার্ড কাউন্সিলরের উচিত নাগরিকদের জন্য নিরাপদ ফুটপাত নিশ্চিত করা।
এদিকে, খোলা ম্যানহোলের বিষয়ে জানতেন না বলে মন্তব্য করেছেন চসিকের ১৫ নম্বর বাগমনিরাম ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন। তিনি বার্তা২৪.কমকে বলেন, ‘ফুটপাতের এরকম অবস্থা হয়ে আছে, সেটা আমি জানতাম না। আমি নিজেও কয়েকবার বইমেলায় গিয়েছি। চোখে পড়েনি। যদি এমনটা হয়ে থাকে, সেটা অনাকাঙ্ক্ষিত, খুবই দুঃখজনক ব্যাপার। আপনি জানিয়েছেন, আমরা শিগগিরই ঢাকনাগুলো লাগানোর ব্যবস্থা করব ইনশাআল্লাহ।’



