বাংলাদেশের রাজনীতিতে আগস্ট মাসের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক মূলত শোক, সহিংসতা ও রাজনৈতিক বিপর্যয়ের স্মৃতিতে জড়িয়ে আছে। কারণ বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ এই দলটির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে এই মাসেই।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে হত্যা করা হয় বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে, যিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাকালীন নেতাও।
শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার ঘটনা দলটির রাজনৈতিক ইতিহাসে এতটাই গভীর প্রভাব ফেলে যে, অগাস্টকে তারা ‘শোকের মাস’ হিসেবে পালন করে এসেছে।
এর প্রায় তিন দশক পর, ২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট ঢাকায় আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা হয় এবং অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান দলটির তৎকালীন সভাপতি শেখ হাসিনা।
আর চব্বিশের পাঁচই আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে পতন হয় আওয়ামী লীগের টানা সাড়ে ১৫ বছরের শাসনের। পরবর্তীতে গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে ভারতে আশ্রয় নেয়া শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেয় ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। পুরো ঘটনাটিকে আওয়ামী লীগের জন্য বড় বিপর্যয় বলে মনে করেন অনেক বিশ্লেষক।
আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৯ সালে। ৭৭ বছরের পুরোনো এই দলটির ইতিহাতে এই তিন ঘটনার প্রেক্ষাপট, কারণ ও পরিণতি এক নয়। ভিন্ন ভিন্ন সময়ে, ভিন্ন বাস্তবতায় ঘটেছে সেগুলো। তারপরও একটি জায়গায় এসে ঘটনাগুলোকে মেলানো যায়, আর তা হলো– আগস্ট।
১৫ আগস্ট: শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ড এবং ঘুরে দাঁড়ানো
৫১ বছর আগে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যসহ বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে ঢাকায় তার ধানমন্ডির বাড়িতে হত্যা করা হয়। তার দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা তখন বিদেশে, ফলে এই দু’জনই কেবল প্রাণে বাঁচেন।
বিশ্লেষকদের মতে, শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পেছনে একক কোন কারণ ছিল না। সদ্য স্বাধীন হওয়া যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে অর্থনৈতিক চরম অব্যবস্থাপনা, চুয়াত্তরের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের ধাক্কা, একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন (বাকশাল), রক্ষীবাহিনীর অতিরিক্ত ক্ষমতা ও দমনপীড়ন এবং দুর্নীতির ব্যাপক বিস্তার সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক মহলে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল।
এ সবের মধ্যেই পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট ভোর পাঁচটার দিকে একদল সেনা কর্মকর্তা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাকে সপরিবারে হত্যা করে এবং ক্ষমতার পালাবদল ঘটায়।
লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ তার ‘বেলা-অবেলা’ বইতে লিখেছেন, “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু আওয়ামী লীগের প্রাণপুরুষ ছিলেন না, বাংলাদেশের রাজনীতির নাটাইটা তার হাতেই ছিল। এক সময় তার ইশারায় সবাই উঠতেন, বসতেন, ছুটতেন।”
কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের অনেক রাজনীতিকের মতোই জনপ্রিয়তা বজায় রেখে তিনি দক্ষতার সঙ্গে সরকার চালাতে পারেননি উল্লেখ করে মহিউদ্দিন আহমদ লেখেন, “জনপ্রশাসন নিয়ে তিনি স্বস্তিতে ছিলেন না। তার পছন্দের লোকদের তিনি প্রশাসনের শীর্ষ পদে বসিয়েছিলেন। দেশ চালানোর জন্য দলকে ব্যবহার করেছেন বেশি। তাকে নিয়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির জন্ম হয়েছিল।”
শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার সময় খন্দকার মোশতাক আহমদ ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলেন। হত্যাকাণ্ডের পর ওই দিনই তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতা তখন খন্দকার মোশতাকের সরকার এবং পরবর্তী সরকারগুলোতে যোগ দেন।
এদিকে, এর আড়াই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে, তেসরা নভেম্বর মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনাকারী প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের চার জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে কারাগারে হত্যা করা হয়। ফলে স্বাধীনতার মাত্র কয়েক বছরের মাথায় আওয়ামী লীগ একদিকে শীর্ষ নেতৃত্বের বড় একটি অংশ হারায়, অন্যদিকে দলটির ভেতরেও দেখা দেয় বিভক্তি ও নেতৃত্বের সংকট।
তবে সাংগঠনিক সংকটে পড়লেও আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দল হিসেবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি। তারা ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছিল, তবে প্রক্রিয়াটি ছিল বেশ দীর্ঘ। দলটির ভেতরে নেতৃত্বের কোন্দল থাকলেও শেখ মুজিবকে হত্যার পর অন্যান্য নেতারা দলকে সংগঠিত করার চেষ্টা করেছেন।
পরে ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতেই তাকে সর্বসম্মতিক্রমে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয় এবং পঁচাত্তরের পর ওই বছরের ১৭ মে প্রবাস থেকে সর্বপ্রথম দেশে ফেরেন তিনি। এরপর ৪৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে দলটির সভাপতি পদেই রয়েছেন শেখ হাসিনা।
পঁচাত্তরের হত্যাকাণ্ডের পর আওয়ামী লীগের রাজনীতির ওপর আনুষ্ঠানিক কোন নিষেধাজ্ঞা ছিল না। কিন্তু “সেইসময় দেশে আওয়ামীবিরোধী অবস্থা বিরাজ করেছিল, শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকারীদের বড় প্রভাব ছিল, দেশে ভয়ের সংস্কৃতি ছিল। এই কারণে দলটির নেতাকর্মীরা তখন দলীয় পরিচয় নিয়ে সামনে আসেননি,” বলছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. জোবাইদা নাসরীন।
তবে শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ড আওয়ামী লীগের প্রতি জনমনে সহানুভূতি তৈরিতে ভূমিকা রেখেছিল বলে মনে করেন তিনি।
তার মতে, “বাংলাদেশে এটা অনস্বীকার্য সত্য যে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধ তখন মানুষের কাছে দগদগে স্মৃতি। প্রতিদিনকার জীবনযাপনে তখন স্বজন হারানোর বেদনা ছিল। তাই এই হত্যাকাণ্ড মানুষের মনে গভীর প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল। সেই স্মৃতি ও সহানুভূতি পরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফিরে আসার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. এস এম শামীম রেজাও বলেন, “সেই সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন রাজনৈতিক পদক্ষেপের সমালোচকরাও শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন করেননি।”
তিনি যোগ করেন, “বিশেষ করে চার নেতার হত্যাকাণ্ড মানুষকে সাংঘাতিকভাবে নাড়া দিয়েছিল। সেদিক থেকে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের ওপর প্রচ্ছন্নভাবে একটি সহানুভূতি তৈরি হয়েছিল। এই দুই হত্যাকাণ্ড আওয়ামী লীগকে মাঠ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়নি।”
এছাড়া, প্রকাশ্যে জোরালো রাজনীতি না করতে পারলেও অনেক আওয়ামী লীগ নেতা তখন দেশের অভ্যন্তরে থাকায় দলটি পুরোপুরি নেতৃত্বহীন হয়ে যায়নি। তৃণমূলেও দলটির নেতাকর্মী ও সমর্থকদের একটি অংশ সক্রিয় ছিল।
এদিকে, শেখ হাসিনার বাংলাদেশে ফিরে আসার পর আওয়ামী লীগ ধীরে ধীরে পুনর্গঠিত হয় এবং আশির দশকে আবার রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে বিভিন্ন নির্বাচনে অংশ নেয়। এরশাদবিরোধী আন্দোলনসহ বিভিন্ন আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে মাঠে ছিল আওয়ামী লীগ। তবে রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরতে আওয়ামী লীগকে অপেক্ষা করতে হয় ২১ বছর। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে দলটি এবং প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন শেখ হাসিনা।
অধ্যাপক শামীম রেজা বলছিলেন, “২১ বছরের মধ্যে ১৩ থেকে ১৪ বছর আনুষ্ঠানিকভাবেই খুবই সক্রিয় ছিল আওয়ামী লীগ। আর তখন নিষিদ্ধের মাঝে না পড়ার কারণে দলটি তার কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে পেরেছে। এত বিপুল সংখ্যক মানুষের বিরুদ্ধে মামলা-জেলজুলুমও তখন হয়নি। ওই সময়ে আওয়ামী লীগের হাজার-হাজার নেতাকর্মী কারাগারেও ছিল না।”
২১ আগস্ট: ‘রাজনীতিতে চিরস্থায়ী দাগ কেটেছে’
শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের প্রায় তিন দশক পর, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আবারও বড় ধরনের আঘাতের মুখে পড়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব। ওইদিন ঢাকায় বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আয়োজিত আওয়ামী লীগের সমাবেশে হামলা হয় যেখানে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা শেখ হাসিনা। একটি ট্রাকের ওপর তৈরি অস্থায়ী মঞ্চে দাঁড়িয়ে বক্তব্য রাখছিলেন তিনি। ওই সময় গ্রেনেড বিস্ফোরণে ২৪ জন নিহত হন, আহত হন কয়েকশ মানুষ।
নিহতদের মধ্যে ছিলেন আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমান। হামলা থেকে প্রাণে বেঁচে গেলেও শেখ হাসিনা আহত হন এবং তার শ্রবণশক্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
হামলার পরপরই বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা ওই হামলার জন্য তখনকার বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল তুলেছিলেন এবং হামলার দায় মাথায় নিয়ে সরকারকে পদত্যাগের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে ২১শে আগস্টের প্রভাব শুধু আওয়ামী লীগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত ভয়াবহ সহিংসতার যেসব ঘটনা ঘটেছে, ওই হামলার ঘটনা তার একটি এবং ওই ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে গভীর প্রভাবও ফেলেছে। বিশেষ করে, ঘটনাটি আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সম্পর্কেও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখেছে।
আশির দশকের আন্দোলনগুলোতে কিংবা নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পাশাপাশি আন্দোলন করেছে। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও দুই দলের মধ্যে তখন যোগাযোগের জায়গা ছিল। কিন্তু ২১শে আগস্টের পর সেই সম্পর্ক আরও বৈরী হয়ে ওঠে।
অধ্যাপক শামীম রেজা বলেন, “ওই ঘটনা রাজনীতিতে চিরস্থায়ী দাগ কেটেছে। এত বড় ফাটল ও দূরত্ব তৈরি করেছে যে এর পর রাজনীতি আর কখনোই আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারেনি।”
তিনি বলেন, ওই ঘটনার পর প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে আস্থার সংকট এতটাই গভীর হয় যে “নব্বইয়ের দশকে যেটুকু রাজনৈতিক সংস্কৃতি ছিল, তা পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। এটি শুধু মুখ দেখাদেখি না, একেবারেই যোগাযোগহীন করে ফেলে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলকে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীনও বলেন, “২১শে আগস্টের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা শিষ্টাচার ছিল। দুই দলের নেতারা একে অপরের অনুষ্ঠানে যাচ্ছিলেন। কিন্তু ২১শে আগস্ট দুই দলের মাঝে চিরস্থায়ী শত্রুতা তৈরি করেছিল।”
ওই ঘটনা দুই দলের বৈরিতাকে নতুন মাত্রা দিলেও একই সঙ্গে এটি আওয়ামী লীগের প্রতি মানুষের সহানুভূতিও এনে দিয়েছিল। ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রতি অনেক মানুষের রাগ-ক্ষোভও ছিল। ফলে, পরবর্তী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয়লাভের ক্ষেত্রেও এটি ভূমিকা রেখেছে বলে মত তার। তবে ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বড় জয়ের পেছনে শুধু ২১শে অগাস্টের হামলাকে কারণ হিসেবে দেখছেন না অধ্যাপক শামীম রেজা।
তার মতে, এক-এগারোর ঘটনাপ্রবাহ, দুই দলের সাংগঠনিক অবস্থা, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রশ্নে বিএনপির অবস্থান, বিএনপি’র পূর্ববর্তী কর্মকাণ্ড এবং তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতিসহ আরও বেশ কিছু বিষয় সম্মিলিতভাবে ওই নির্বাচনের ফলাফলে ভূমিকা রেখেছিল।
৫ আগস্ট: জনরোষ ও ক্ষমতাচ্যুতি
পঁচাত্তরের বিপর্যয় কাটিয়ে আওয়ামী লীগ শেষ পর্যন্ত ঘুরে দাঁড়িয়েছিল; কিন্তু পাঁচই আগস্টের পর দলটি যে পরিস্থিতিতে পড়েছে, সেটিকে আরও জটিল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের অনেকে।
২০০৯ সালে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে যে দলটি সরকার গঠন করে, তারা টানা সাড়ে ১৫ বছরের বেশি ক্ষমতায় থাকার পর ২০২৪ সালের পাঁচই অগাস্ট ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়। সেদিনই সামরিক বাহিনীর সহায়তায় দেশ থেকে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন শেখ হাসিনা। তার সাথে তার বোন শেখ রেহানাসহ পরিবারের সদস্যরাও ছিলেন।
চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা নিয়ে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিলো, তা পরে এক দফা অর্থাৎ শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবিতে রূপ নিয়েছিল। একের পর এক প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন, মানবাধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়ার অভিযোগ, দুর্নীতিসহ নানা ইস্যুতে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ বাড়ে তখন। ওই আন্দোলন দমনে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ এবং ব্যাপক প্রাণহানির অভিযোগও রয়েছে শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে।
জাতিসংঘের রিপোর্টে বলা হয়েছে, জুলাই-অগাস্ট গণ-অভ্যুত্থানের সময় নিহতের সংখ্যা ১৪শ জনের মতো হতে পারে। অন্যদিকে, মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় থেকে ‘জুলাই শহীদের’ সর্বশেষ যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে, সেখানে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৪৩ জনে।
এদিকে, পাঁচই আগস্ট শুধু শেখ হাসিনা ও তার পরিবার নন, আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতা দেশ ছেড়েছেন, আত্মগোপনে গেছেন কিংবা পরে মামলার মুখে পড়েছেন। ফলে পঁচাত্তরের মতো এবারও দলটির সামনে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক পুনর্গঠন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীন মনে করেন, পঁচাত্তর ও পাঁচই আগস্টের মধ্যে এখানে একটি বড় পার্থক্য রয়েছে। পঁচাত্তরে শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডে অনেক মানুষ ‘ব্যথিত’ হয়েছিল বলে জনমনে আওয়ামী লীগের প্রতি সহানুভূতি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারিয়েছে ব্যাপক জনঅসন্তোষ ও আন্দোলনের মুখে।
“মুক্তিযুদ্ধের নেতা শেখ মুজিব হত্যার শিকার হওয়ায় পাঁচ বছরের মধ্যেই তখন আওয়ামী লীগের ফিরে আসা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু এখনকার পরিস্থিতি ভিন্ন। আওয়ামী লীগ এবার জনবিচ্ছিন্ন দলে পরিণত হয়েছিলো। জনগণের মতামতকে তারা তোয়াক্কা করছিল না।”
তার মতে, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার সময় শেখ হাসিনার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ, পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতি এবং দলের ভেতরে গণতান্ত্রিক চর্চার অভাব আওয়ামী লীগকে দুর্বল করেছে। ফলে “পচাত্তরের পরে তাদের ফিরে আসতে যত কষ্ট হয়েছে, এখন তার দ্বিগুণ বা আরও বেশি সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হবে আওয়ামী লীগকে।”
অধ্যাপক শামীম রেজাও বর্তমান সংকটকে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভিন্ন এবং বড় বলে মনে করেন। কারণ, পঁচাত্তরের মতো এবার আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বদের কেউ-ই দেশে নেই। তাই, বিকল্প নেতৃত্ব তৈরির সংকটকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন তিনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রজন্মগত পরিবর্তন।
অধ্যাপক শামীম রেজার মতে, এখনকার তরুণ জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক চিন্তা, প্রত্যাশা ও নেতৃত্বকে গ্রহণ করার মানসিকতা আগের প্রজন্মের চেয়ে আলাদা। “বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপালে যে পরিবর্তনগুলো হয়েছে, তা একটি ধারণা দিচ্ছে যে রাজনীতিতে একটি প্রজন্মগত পরিবর্তন হয়েছে।”
ফলে পুরোনো রাজনৈতিক কৌশল দিয়ে সমর্থন ফিরে পাওয়া তাদের জন্য কঠিন হতে পারে।
তিনি বলছিলেন, আওয়ামী লীগ তাদের প্রথম শাসনামলে যে ভুলগুলো করেছিলো, দেখা গেছে যে ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে, অর্থনৈতিক পরিকল্পনার ক্ষেত্রে, এমনকি দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তারা সেখান থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেছে।
“কিন্তু এবার এত বড় পরিবর্তন, যেখানে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু জড়িত, সহিংসতা যুক্ত, যেখানে যেখানে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বকে-প্রশাসনকে-সিদ্ধান্ত গ্রহণকে প্রশ্ন করা হচ্ছে…সেখানে একেবারে অনুতাপহীনভাবে এটিকে কোনো গুরুত্ব না দিয়ে আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে কতখানি প্রত্যাবর্তন করতে পারবে, এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ,” বলেন অধ্যাপক শামীম রেজা।
তাই আওয়ামী লীগ আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কি না, সেটি শুধু দলটির সাংগঠনিক শক্তির ওপর নির্ভর করছে না। নেতৃত্বে পরিবর্তন, অতীতের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন এবং নতুন করে জনসমর্থন অর্জন করতে পারে কি না, তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করবে দলটির ভবিষ্যৎ।
তবে, দলটির ফিরে আসা প্রশ্নে অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন এও বলেছেন, “যখন কোন ক্ষমতাসীন দলের প্রতি মানুষের অনাস্থা তৈরি হয়, সেটার ফল যায় বিরোধী দলের দিকে।” অর্থাৎ, তিনি মনে করেন যে গত দুই বছরে আওয়ামী লীগের প্রতি মানুষের সমর্থন কিছুটা বেড়েছে। তবে তা আওয়ামী লীগের যোগ্যতা বা কর্মকাণ্ডের কারণে নয়।
“ইউনূসের শাসনামলে মুক্তিযুদ্ধকে আক্রমণ, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে নিয়ে কথাবার্তা, ভাঙচুর, রাজনীতিতে জামায়াতের আধিপত্য, নারীর প্রতি ঘৃণা প্রদর্শন – এগুলো আওয়ামী লীগের প্রতি সমর্থন তৈরিতে সহায়তা করেছে। চব্বিশের নানা ধরনের বাহাস-ন্যারেটিভ; বর্তমানে অংশীদের মাঝে নানা ধরনের মতানৈক্য, সংঘর্ষ- এর বেনিফিটও যাচ্ছে আওয়ামী লীগের ঘরে।”
তাই, বাংলাদেশে আবারও আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা বাড়লে সেই কৃতিত্ব আওয়ামী লীগের না, বরং এর দায় অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান বিএনপি সরকারের। কারণ তারা যখনই জনমনে আস্থা তৈরি করতে পারছে না, তখন মানুষের মনে হচ্ছে “আগেই ভালো ছিলাম” – যোগ করেন জোবাইদা নাসরীন।
বারবার আগস্ট: নিছক ঘটনাচক্র নাকি যোগসূত্র আছে?
তাহলে আওয়ামী লীগের ইতিহাসের বড় এই তিনটি ঘটনা আগস্টেই ঘটার পেছনে কি কোনো যোগসূত্র রয়েছে, নাকি এটি শুধুই ঘটনাচক্র?
রাজনৈতিক বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীন মনে করেন, ১৫ই অগাস্ট ও ২১শে আগস্টের মধ্যে একটি যোগসূত্র খোঁজার সুযোগ থাকলেও পাঁচই আগস্টের ঘটনাকে একইভাবে দেখা কঠিন।
তার মতে, “১৫ই অগাস্ট ও ২১শে অগাস্ট – পরিকল্পিত ছকে বাঁধা। অগাস্টকে কেন্দ্র করেই ২১শে অগাস্ট হয়েছে বলে মনে করি। ১৫ই অগাস্টে একটি পরিবার শেষ হয়েছে। ২১শে অগাস্ট একটি বড় ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। কিন্তু গণঅভ্যুত্থান, প্ল্যান করে হয়েছে বলে আমি মনে করি না।”
অধ্যাপক শামীম রেজা অবশ্য তিনটি ঘটনার মধ্যে সরাসরি কোনো যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া কঠিন বলেই মনে করেন। কারণ ঘটনাগুলোর সময় ও প্রেক্ষাপট আলাদা এবং লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে একক কোনো রাজনৈতিক ব্যাখ্যা নেই।
“খুব নির্মোহভাবে, যুক্তি দিয়ে দেখলে এখানে কোনো যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া কঠিন, কাকতালীয় বলেই মনে হয়” বলছিলেন তিনি।
“তিনটি ঘটনার মধ্যে একটি সাধারণ মিল হলো, প্রতিটি ঘটনাই অত্যন্ত সহিংস। ঘটনাগুলোতে হত্যাকাণ্ডের মতো বিষয় যুক্ত। তখনকার সময় যারা এই পরিকল্পনা করেছেন, তাদের প্রতীকী কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না, এটি ঐতিহাসিক বিশ্লেষণেও স্পষ্টভাবে উঠে আসেনি।”
“আর, সেদিক থেকে চিন্তা করলে…১৫ আগস্ট একটি দেশের জাতীয় দিবসের সাথে মিলে যায়। অন্য দু’টোকে মেলানো যায় না,” আরও বলেন অধ্যাপক শামীম রেজা।
তিনি জানান, ২১শে আগস্টের হামলার ক্ষেত্রে আগস্ট মাসকে প্রতীকীভাবে বেছে নেওয়া হয়েছিল কি না, তার স্পষ্ট কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
“আর চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান যেভাবে সংঘটিত হয়েছে এবং যেভাবে আন্দোলনটা এক দফা দাবিতে পরিণত হয়েছে…সেটিকে ওইভাবে পরিকল্পনা করে, নির্দিষ্ট দিনক্ষণ হিসেব করে, একদম অগাস্ট মাসেই ফেলা হয়েছে, এই ধরনের তথ্য প্রমাণ হাজির করা কঠিন।”
ফলে, কোনো তত্ত্বেই এগুলোর মাঝে যোগসূত্র তৈরি করা না গেলেও ভিন্ন ভিন্ন বাস্তবতায় ঘটে যাওয়া এই তিনটি ঘটনা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ইতিহাসকে পাল্টে দিয়েছে।


